জনসংখ্যা জটিলতায় লকডাউন নিয়ে বিভ্রান্তি! ChannelCox.com

Najim UddinNajim Uddin
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৯:০২ PM, ২০ জুন ২০২০

চ্যানেল কক্স ডটকম:

দেশে আদমশুমারি হয়েছিল ২০১১ সালে, সে তুলনায় এখন জনসংখ্যা বেড়েছে অনেক। তাই জনসংখ্যার অনুপাতে লকডাউন কার্যকর নিয়ে জটিলতা হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে লকডাউন ঘোষণাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর যে জনসংখ্যা ধরে লকডাউনের কথা বলেছিল, কিছু কিছু এলাকায় সে জনসংখ্যার চেয়ে এখন অনেক বেশি মানুষের বসতি হওয়ায় লকডাউন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা প্রতিবেদককে বলেন, রেড-ইয়েলো-গ্রিন জোন ভাগ করার যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে সেটা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। এমনও হয়েছে, কোনও এলাকার জনসংখ্যাই ১০ হাজার। সেখানে যদি একজন রোগী হন তাহলে তাকে কোন জোনে ফেলা হবে, কিংবা সে এলাকা রেড জোন হবে কিনা, এমন প্রশ্নও আসছে। আবার যদি কোনও এলাকার ১০টি বাড়িতে রোগী পাওয়া যায়, তাহলে সেই ১০ বাড়ি নিয়েই লকডাউন করা যায় কিনা সেটাও এখন ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। এসব কারণে পুরো বিষয়টি আবার রিভিউ করতে হচ্ছে। শুধু জনসংখ্যা দিয়ে এটা হয় না, আরও অনেক ফ্যাক্টর রয়েছে জানিয়ে তারা বলছেন, সে ফ্যাক্টরগুলো নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। যে কারণে সময় লাগছে। লকডাউন নিয়ে এখনও পর্যালোচনার কাজই করে যাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এত কমিটির মধ্যে আমাদের মধ্যে এত বিশেষজ্ঞ যে একমত হওয়াটাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আর এসব কারণে এখন একটা ম্যাপিং ‍টুল তৈরি করা হচ্ছে। এই ম্যাপিং টুলে অনেক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইউনিট হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো জনবহুল এলাকায় রাস্তাসহ ম্যাপিং হচ্ছে। এটা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।’

করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর দিক দিয়ে এশিয়ায় এখন বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। প্রথম অবস্থানে ভারত। এর পরের অবস্থানে পাকিস্তান। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১৭তম।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিন জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ৮৭তম দিনে করোনা শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার ৯৫তম দিনে ১২ জুন আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ হাজার ছাড়িয়েছিল, আর শনাক্ত হওয়ার ১০৩তম দিনে দেশে রোগী শনাক্ত হন এক লাখ ২ হাজার ২৯২ জন।

করোনাভাইরাসের বিস্তার বন্ধ করতে পূর্ণ লকডাউন প্রয়োজন বলে মনে করে কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। তারা সারাদেশে আক্রান্ত ও ঝুঁকির মাত্রার ভিত্তিতে যতটা বড় এলাকায় সম্ভব জরুরি লকডাউনের সুপারিশ করে। কিন্তু লাখে ঢাকা শহরে কতজন হলে কোন এলাকাকে কোন জোন করা হবে সে বিষয়ে এর আগে বলা হলেও সেটা চূড়ান্ত হয়নি।

গত ১৪ দিনে প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার ভেতরে ৬০ জন রোগী থাকার ভিত্তিতে রেড জোন ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়। তবে এটা কেবল ঢাকা ও চট্টগ্রামের জন্য প্রযোজ্য। বাকি জেলাগুলোতে ১৪ দিনের ভেতরে ১ লাখ জনসংখ্যায় ১০ জন থাকলে সেটাকে রেড জোন ঘোষণা করা হবে।

প্রাথমিকভাবে পূর্ব রাজাবাজার লকডাউন করা হলেও সব জায়গায় কেন লকডাউন কার্যকর হচ্ছে না জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাখে কতজনে লকডাউন হবে সেটা এখনও নির্ধারিত নয়। প্রথমে লাখে ৩০ বলা হলেও পরবর্তীতে সেটা ৬০ জন  বলা হচ্ছে।

কতজন রোগী কোন জোনে ধরে জোন নির্ধারণ করা হবে সে নিয়ে শুরু থেকেই মতভেদ ছিল বলে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের একাধিক সূত্র।

আবার যে এলাকায় যে জনসংখ্যা বলছে সেটা অনেক আগের আদমশুমারি। এখন সেখানে জনসংখ্যা অনেক বেশি। ফলে রেড জোন ঘোষণা হলেও এই সংখ্যাতাত্ত্বিক জটিলতায় লকডাউন ঘোষণা হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার ভেতরে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দেবে স্বাস্থ্য অধিদফতর আর ঢাকার বাইরে রেড জোন, ইয়েলো জোন এবং গ্রিন জোনের সিদ্ধান্ত নেবেন স্থানীয় জেলা সিভিল সার্জন।

জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং জাতীয় কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গাতে রোগী সংখ্যা কাটঅফ (গড় হিসাবে ধরে) করে কাজ করা হলেও সবই চূড়ান্ত নয়। এখনও আলোচনা চলছে।’

নারায়ণগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন ডা. ইমতিয়াজ মাহমুদ প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে রূপগঞ্জে রেড জোন করা হয়েছে ৩৮ জন রোগীর ভিত্তিতে। অন্যান্য জায়গায় কাজ চলছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পপুলেশন সাইজ নিয়ে। কোন এলাকায় কত জনসংখ্যা এটা পেতে সমস্যা হচ্ছে। আসল জনসংখ্যা ও ঘনত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’

ডা. ইমতিয়াজ মাহমুদ আরও বলেন, ‘রেড জোন ঘোষণা করতে হলে প্রতি লাখ জনসংখ্যা হিসেবে ঘোষণা করতে হয়। কিন্তু কোন এলাকায় কত লাখ মানুষের বসবাস তার সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য কোথাও নেই, সবার কাছে আনুমানিক হিসাব। কিন্তু আনুমানিক হিসেবে জোন ঘোষণা করা যায় না, কাছাকাছি হলেও নেওয়া যায়, কিন্তু পার্থক্যটা অনেক। আমাদের কাছে রয়েছে ২০১১ সালের হিসাব, কিন্তু কারেন্ট তথ্য নেই। যার কারণে সমস্যা হচ্ছে।’

জাতীয় কারিগরি পরমর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেন, ‘লকডাউনের অনেক কাজ রয়েছে। কেবল বলে দিলেই হয় না। সংক্রমিত রোগী, তাদের সংস্পর্শে আসা মানুষ এবং তাদের সবার ব্যবস্থা করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েই লকডাউন করতে হবে। এখানে অনেক সংস্থার অনেক কাজ করার রয়েছে।’

জেলাগুলোতে জনসংখ্যার অনুপাত নিয়ে লকডাউন করতে গেয়ে জটিলতা হচ্ছে জানালে তিনি বলেন, ‘২০১১ সালের পর পোলিও, ইপিআই এর টিকা দেওয়ার জন্য অনেকবার লোকসংখ্যা গোনার কাজ হয়েছে। এছাড়া এত বছরে লোকসংখ্যা বেড়ে কত হতে পারে সেটা আন্দাজও করা যায়।’

লকডাউন বিভ্রান্তি নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ প্রতিবেদককে বলেন, ‘যে কতগুলো এলাকাকে এক্সপেরিমেন্টাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল শুরুতে সেসবের কাজই শেষ হয়নি, এগুলো চলবে। প্রথম যে ৪৫ এলাকাতে চিহ্নিত করা হয়েছিল সেগুলো একটা হিসাবে করা হয়েছিল। সেই হিসাবটা একটা মিটিংয়ে বলা হয়েছিল। আর এখন যখন যেখানে যেমন করে প্রয়োজন তেমন করে হবে। ঢাকার পূর্ব রাজাবাজার ও জেলাগুলোতে শুরু হয়েছে। ওয়ারীতে শুরু হবে।’

কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ে জেলাগুলোতে সমস্যা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২০১১ সালের জনসংখ্যাকে একটা এস্টিমেট ধরে বর্তমান জনসংখ্যার ওপর করা হচ্ছে।’

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন।

Channel Cox News.

আপনার মতামত লিখুন :