পদ-পদবীর সাথে বেড়েছে আবদুল্লাহ’র অপরাধ সাম্রাজ্য | ChannelCox.com

Najim UddinNajim Uddin
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৯:২৭ PM, ৩০ জুলাই ২০২০

চ্যানেল কক্স ডটকম ডেস্ক:

মাথাগুজার কয়েক শতক জমি ছাড়া সহায়-সম্পদ বলতে তেমন কিছু ছিলো না কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজার হাজিপাড়ার গুরা মিয়ার। সংসার চলতো দিন মজুরিতে। ঝিলংজার সাবেক চেয়ারম্যানসহ বিত্তশালী পরিবারে মাসিক কামলা হিসেবে শ্রম দিতেন তিনি। একই অবস্থা ছিল তার ভাই দুদু মিয়ারও। পরিবারে ঠিকমতো ভরণপোষণ হতো না। তাই কিশোর বয়স থেকেই ছেলেরা নানা কাজ করে পরিবারে সহযোগিতা করতো। এরপরও ছিল টানাপোড়ন। মাত্র ১০ বছর আগেও পরিবারগুলোর এ চিত্র সবাই দেখেছে।

কিন্তু দৃশ্যমান কোন ব্যবসা না থাকলেও বিগত ৭-৮ বছর পূর্ব থেকে গুরামিয়ার ৫ম ছেলে আবদুল্লাহর বদৌলতে পাল্টাতে থাকে পরিবারের আর্থিক চিত্র। সরকারদলীয় সহযোগী সংগঠন শ্রমিক লীগের সদর উপজেলা আহবায়ক, সিএনজি পরিবহন সমিতির বাসটার্মিনাল এলাকার সভাপতি হিসেবে লাইন দেখভাল এবং সম্প্রতি যোগ হয়েছে কমিউনিটি পুলিশিং ইউনিয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদকের পদ। এসব পদ-পদবি বাড়ার সাথে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র বাহিনী। যারা নিয়ন্ত্রণ করছে পরিবহন থেকে চাঁদা আদায়, জমিদখল, অপহরণ, ইয়বা ব্যবসাসহ নানা অপরাধ। এসবে ভাগ্যের চাকা দ্রুত ঘুরে মালিক হয়েছে বিত্তবৈভবের। কিন্তু এতদিন কেউ মুখ খুলেনি।

গত ১৩ জুলাই তার সেজ ভাই চা-দোকানি ফোরকান দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়বাসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে তাদের অপরাধের কাহিনী। তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় দায়িত্বশীলরা জানায়, শ্রমজীবী গুরামিয়ার ছেলেরা ১০ বছর আগেও চুরি-ছিনতাই করে বেড়াত। তাদের মাঝে দুর্ধর্ষ ছিলো পঞ্চম ছেলে আবদুল্লাহ। কক্সবাজার পৌরসভার বড়বাজার ও উপজেলা গেইট জামে মসজিদ থেকে জুতা চুরি এবং পর্যটকের মোবাইল ছিনতাইয়ে ধরা পড়ে প্রহারে শিকার হয়েছিলেন মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে না পারা আবদুল্লাহ। তার অপর ভাইয়েরাও একইভাবে এলাকার বাসাবাড়ি থেকে এটা-সেটা চুরি করে প্রায় প্রতিদিনই বিচারের মুখোমুখী হতো। তখন স্থানীয় ছুরুত আলম নামের এক ব্যক্তি আবদুল্লাহর ভাই ফোরকানকে চায়ের দোকানটি গড়ে দেন। কিন্তু অভাবের সাথে বড় হওয়া আবদুল্লাহ বিত্তশালী হওয়ার স্বপ্নে জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা কারবারে।

তারা আরো জানায়, স্বপ্ন বাস্তাবায়নে চাচাতো ভগ্নিপতি টেকনাফ নাজিরপাড়ার ইউসুফের ছেলে ইউনুস ওরফে লেডুর সাথে যোগদেয় আবদুল্লাহ। জেলা সদরের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে হাজিপাড়ায় ইয়াবার চালান আনা শুরু করেন তিনি। চালান নির্বিঘগ্ন করতে টেকনাফ টু ঝিলংজায় গড়ে তোলা হয় ২০-২২ জনের শক্তিশালী ইয়াবা সিন্ডিকেট। সন্ডিকেটে আপন-চাচাতো ৫ ভাই, ৩ বোন, ৩ ভগ্নিপতি, ৩ ভাগ্নে ও একভাগ্নে জামাইসহ পরিবারের ১৫জন এবং রোহিঙ্গাসহ দুর্ধর্ষ অপরাধি আরো ৫-৬জনকে যুক্ত করা হয়। এদের মাঝে ফোরকান চায়ের দোকানে, মেঝভাই হেফাজ আহমদ খাদ্যগুদাম, উপজেলা কম্পাউন্ড ও গাড়ির স্টাফদের কাছে ইয়াবা সরবরাহ দেন। ভাগ্নে হারুন নিয়ে যান কক্সবাজারে এক স্থান হতে অন্যস্থানে। সহযোগীতা দেন ভাই আব্দু করিম এবং চাচাত ভাই শহীদ। এরই মাঝে ২০১৩ সালের শেষের দিকে ইয়াবা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে চোচাতো বোন শানুর সাথে আবদুল্লাহর মারামারি হয়। যা মামলা পর্যন্ত গড়ায়।

এরপর ক্ষমতা নির্বিঘগ্ন করতে জেলা শ্রমিকলীগ সভাপতিকে উপঢৌকনে বশে এনে বাগিয়ে নেয় শ্রমিকলীগ সদর দক্ষিণ কমিটির আহবায়কের পদটি। এরপর তাকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে ইয়াবা সারাদেশে সরবরাহ দেয়ার নেটওয়ার্ক করে আবদুল্লাহ। এক হয়ে যান পরিবারের সবাই। মাঝে মাঝে প্রশাসনের অভিযানে পড়ায় পুলিশের কাছাকাছি গিয়ে সখ্যতা গড়তে সম্প্রতি কমিউনিটি পুলিশিং ঝিলংজা ইউনিয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদকের পদটিও নিজের দখলে নিয়েছেন আবদুল্লাহ। অবশ্য এজন্য তার সভাপতি ইউপি মেম্বার কুদরত উল্লাহকে নগদ কয়েক লাখ টাকা ‘হাদিয়া’ দিয়েছেন বলে প্রচার রয়েছে। কুদরত মেম্বার জেলা শ্রমিকলীগ সভাপতি জহিরুল ইসলামের ছোট ভাই। মূলত তারা দু’ভাই আবদুল্লাহর অপকর্মের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগী বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সূত্রমতে, কুদরতকে হাতে পেয়ে লিংকরোড় ও টার্মিনাল এলাকায় ইয়াবা ছিনতাই শুরু করে আবদুল্লাহর গ্রুপ। আবদুল্লাহকে সশস্ত্র পাহারায় রাখেন বিস্ফোরণ,হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামী হাজীপাড়ার নাজমুল হুদা টুইল্যা ও ইয়াবা কারবারী বার্মাইয়া আবদুর রহিম। তাদের মাঝে আবদুর রহীম সিএনজি যোগে ইয়াবা আনা ও ছিনতাইকালে এবং আবদুল করিম নৌ-পথে ইয়াবা আনার দায়িত্ব পালন করে।

সূত্র আরো জানায়, শ্রমিকলীগ নেতার তকমায় কক্সবাজার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে জেলা সিএনজি অটো রিক্সা সমিতির নাম ভাঙ্গিয়ে প্রতিদিনি হাজার হাজার টাকা চাঁদা তুলে তারা। মাল লোড-আনলোড করতে ঝিলংজার খাদ্য গুদামে আসা ট্রাক প্রতি দুই’শ টাকা আদায় করে তার সিন্ডিকেট। এ দু’সেক্টর থেকে তার সিন্ডিকেটের আয় প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার টাকা।

ইতোমধ্যে বোনজামাই ইউনুস ১৮ হাজার পিস ইয়াবাসহ ঢাকার মিরপুরে আটক হয়ে বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম রেলওয়ে এবং কক্সবাজার সদর থানাতেও ইয়াবা সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। মিরপুরের মামলায় তার স্ত্রী শানুও আসামী। শানু চট্টগ্রাম বাকলিয়া থানাতেও ইয়াবায় অভিযুক্ত হয়ে জেল খেটেছেন। ইয়াবা নিয়ে নোহাসহ আটক আছেন আবদুল্লাহর আপন ভগ্নিপতি ঈদগাঁওর শাহজাহান, আরেক ভগ্নিপতি ইমরান, বোন মমতাজ বেগম, শামসুন্নাহার, ভাগ্নী জামাই ঝিলংজার দক্ষিণ ডিককুলের বার্মাইয়া জাবেদ, ভাগ্নে শামশু, আয়াসও আটক রয়েছেন।

ইউনুসের ভাতিজা ও তাদের টেকনাফ অংশের প্রধান টেকনাফের নাজিরপাড়ার আলোচিত ইয়াবা কারবারী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত জিয়াউর রহমান ও নুরুল ইসলাম মংকিরি সম্প্রতি আইনশৃংখলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এরপরও থেমে নেই তাদের বাণিজ্য। গত ২৩ জুলাই কক্সবাজার মডেল থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, নগদ টাকা ও ইয়াবার লেনদেনের ডায়রীসহ শানুকে আটক করে কক্সবাজার কারাগারে পাঠিয়েছে।

এদিকে, সিন্ডিকেট সদস্য আপন ভাই ও চাচাতো বোন ইয়াবা, নগদ টাকাসহ আটকের পর নিজেকে সাধু উল্লেখ করে স্থানীয় গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন শ্রমিকলীগ ও কমিউিনিটি পুলিশিং নেতা ইয়াবা গডফাদার আবদুল্লাহ। তার সিন্ডিকেট সদস্যরা অসংখ্য মামলার আসামী হলেও সরকার দলীয় সহযোগী সংগঠনের পদবি, ইয়াবার কালো টাকা এবং বিভিন্ন কৌশলে নিজেকে রক্ষা করলেও আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ ২টি মামলা চলমান রয়েছে। এরপরও বহাল তবিয়তে তার অস্ত্রধারী সিন্ডিকেট অন্যের খাস দখলীয় এবং ক্ষেত্র বিশেষে রেজিস্টার জমিও দখল করছে। বিচারের নামে আটক করে নির্যাতনের মাধ্যমে বিভিন্নজনের কাছ থেকে টাকা হাতায় তারা।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে নিজের ইয়াবা সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করেন আবদুল্লাহ। তবে, খাদ্যগুদাম এলাকার ট্রাক ও সিএনজি থেকে বৈধতার মাধ্যমে টাকা নিয়ে সংগঠনেও দেয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। বলেন, আমার বাবা-দাদারা পুরোনো সম্পদশালী। সেসবের উপর ভর করেই আমাদের আয়। সবকিছুর কাগজপত্র রয়েছে, আপনাকে (প্রতিবেদককে) দেখাতে আসবো। কিন্তু পরে তিনি আসেননি এবং ফোনও ধরেননি।

জেলা সিএনজি অটো রিক্সা সমিতির সভাপতি রাশেদুল মোস্তফা বলেন, সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে আবদুল্লাহ টাকা তুলছেন। তার কমিটি কয়েক বছর আগেই ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এরপরও শ্রমিকদের ঘাম ঝরানো টাকা জোর করে আদায় করে পকেটস্থ করছেন তিনি। এটা বেআইনী, তবে টার্মিনালে না যেয়ে উপায় নেই বলে আমরাও নিরুপায়।

জাতীয় শ্রমিকলীগ কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি জহিরুল ইসলাম সিকদার চকমপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো উপজেলা পরিষদ এলাকায় কেউ ছিল না, তাই আবদুল্লাহকে শ্রমিকলীগের সভাপতি বানিয়েছি। খুবই দরিদ্র পরিবারের সন্তান আবদুল্লাহ যেন ভালো চলতে পারে তাকে সিএনজি সমিতির সভাপতি, মসজিদ পরিচালনা কমিটির অর্থসম্পাদক, স্কুল পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি এবং সর্বশেষ কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এর বিনিময়ে কোন টাকা নেয়া হয়নি। সে দখলবাজি, মাদকসহ কোন অপরাধে নেই।

নামসহ কয়েকজন প্রবাসী এবং স্থানীয় মানুষের জমি দখলের বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোন সদুত্তর করেননি। তবে, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কক্সবাজার পৌর আওয়ামীলীগের ১৩ নম্বর বর্ধিত ওয়ার্ড সভাপতি হাজিপাড়ার প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা জাফর আলম বলেন, চারদলীয় জোটের আমলে আবদুল্লাহরা শিবিরের সাথে মিছিল-মিটিংয়ে যুক্ত থাকতো। আওয়ামীলীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আশ্চর্য্যজনক ভাবে শ্রমিকলীগের সোজা সভাপতির পদ পেয়ে বসে। দিনে দিনে পদ-পদবি বাড়ায় তার অপরাধের সাম্রাজ্যও বেড়েছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, মাদক কারবারি ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে চিরুনী অভিযানের শুরু হয়েছে। সরকারি বা বিরোধী দল বিবেচনায় নয়, অপরাধ বিবেচনায় সবকিছু খতিয়ে দেখে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং হবে।

সূত্রঃ বাংলাধারা।

Channel Cox News.

আপনার মতামত লিখুন :