ঘরে আগুনের বিচারের জন্য মন্ত্রীর কাছে গিয়ে ‘সাড়া পাননি’ প্রিয়া সাহা

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৮:২৭ PM, ২৫ জুলাই ২০১৯

‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাথে প্রিয়া সাহার সাক্ষাৎ ও সাক্ষাৎকার’ বিষয়ে বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করার পর প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে উত্তেজনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পুরো জাতিকে আশ্বস্ত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন রানা দাশগুপ্ত।

প্রিয়া সাহার গ্রামের বাড়িতে হামলা হয় গত মার্চে 

ওই ঘটনার পর প্রিয়া সাহাকে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী কাজের জন্য তাকে বহিষ্কারের কথা সে সময় জানিয়েছিলেন সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত।

সে বিষয়ে এখন তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রিয়া সাহার পরিচয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ হওয়ায় বিভ্রান্ত্রির সৃষ্টির কারণে তাকে সংগঠন থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

প্রিয়া সাহাকে নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ, আশ্বস্ত করলেন মোমেন  

দলিত সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘শারি’র পরিচালক প্রিয়া সাহা ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে ওয়াশিংটনে আয়োজিত এক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গত ১৭ জুলাই হোয়াইট হাউজে গিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করেছিলেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বলেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মৌলবাদীদের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নিখোঁজ (ডিজঅ্যাপিয়ার্ড) হয়েছেন। তারা যেন দেশে থাকতে পারেন, সেজন্য ট্রাম্প যেন সহায়তা করেন।

তার ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় বিভিন্ন মহলে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কঠোর ভাষায় তার সমালোচনা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রানা দাশগুপ্ত বলেন, “প্রিয়া সাহার পৈত্রিক বাড়ি যে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এটি সত্য। বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এ সংবাদ যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। এরপর কয়েক দিন আগে দেখলাম প্রিয়া সাহা এ ঘটনায় বিচার চেয়েছিল কি না বলে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি বিচার চেয়েছিলেন।”

গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

পৈত্রিক বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনার বিচারের চেয়ে প্রিয়া সাহা সরকারের বিভিন্ন দ্বারে দ্বারে যান জানিয়ে ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, “আমার সামনেই শহীদ মিনারে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী এস এম রেজাউল করিম, তিনি ওই এলাকার সাংসদ, তার কাছে বিচার চেয়েছিলেন। কিন্তু রেজাউল করিম সাহেব সম্মানজনকভাবে তার সাথে কোনো কথা বলতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এগুলো আমার চোখের সামনে হয়েছে।”আইনজীবী রানা দাশগুপ্ত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করছেন। মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, “ব্যক্তির যদি ঘর-বাড়ি জ্বলে থাকে, তাও আবার মানবাধিকারকর্মী প্রিয়া সাহার পৈত্রিক বাড়ি, সাধারণ হিন্দুদের কথা বাদই দেন, বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের কথা বাদ দেন। আপনারা নিজেদের (সাংবাদিক) কথা বিবেচনা করেন, আপনাদের বাড়ি-ঘর যদি জ্বালিয়ে দেওয়া হত, বিচার চাওয়ার পরও কোথাও বিচারের মুখোমুখি না হয়, আপনাদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ হত কি না?”

তিনি বলেন, “ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে কী বলেছেন এটা আমাদের বিচার্য নয়। ক্ষোভ থেকে বলেছেন কি না সেটাও আমরা জানি না। তবে এ কথা ঠিক ব্যক্তিত্বে ক্ষোভ হতেই পারে।

“আমি ক্ষতিগ্রস্ত হলাম, বিচার চাইলাম, মামলা করলাম, কিন্ত কেউ নাই! বরং উল্টো কথা, প্রিয়া সাহা নাকি নিজের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছেন, এটা হয়?”

নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন প্রিয়া সাহা  

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের এই অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী রেজাউল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রিয়া বালার পৈত্রিক বাড়ি আমার ইউনিয়নে। তার বড় ভাই আমার বন্ধু। একটি পরিত্যক্ত ঘর পোড়াকে ঘিরে থানায় মামলা দায়ের করেন প্রিয়া বালার ভাইয়ের কেয়ারটেকার।সেখানে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।

“অন্য ধর্মবালম্বীদের অভিযুক্ত বা সন্দেহ করা হয়নি। তদন্তে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।”

গত ৩ মার্চ রাতে পিরোজপুরের নাজিরপুরে প্রিয়া সাহার পৈত্রিক বাড়িতে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করেন শতাধিক মানুষ। ভাংচুর-লুটপাটের পর ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে প্রিয়া সাহার স্বজনদের অভিযোগ।

এ ঘটনার পর ওই বাড়িতে পুলিশ পাহারা বসানো হয়। মামলায় কারও নাম উল্লেখ না থাকলেও হামলার ঘটনায় পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে, যাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয়ই ছিলেন।

এই হামলার জন্য স্থানীয় একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যকে দায়ী করেন প্রিয়া সাহার গ্রামের বাসিন্দা গৌরাঙ্গ মন্ডল।

সম্প্রতি তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাত ১১টার দিকে জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাসের (প্রিয়া সাহার ভাই) ভোগ দখলীয় জমি দখল করতে স্থানীয় ইউপি সদস্য নজরুল সরদারের নেতৃত্বে শতাধিক সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই জমিতে প্রবেশ করে তাদের মাছের ঘের থেকে মাছ লুট-পাট শুরু করে।

“বিষয়টি স্থানীয়রা মাটিভাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে জানালে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা পুলিশদের ওপরও চড়াও হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনে।”

তার নির্বাচনী এলাকায় সংখ্যালঘুরা ‘অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে’ বসবাস করছেন দাবি করে রেজাউল করিম বলেন, “তাছাড়া কোনো ঘটনার বিষয়ে আদালত বা থানায় মামলা হলে এমপি বা মন্ত্রীর বিচার করার কোনো অবকাশ থাকে না। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিধানে আমি সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করি।”

ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিক্রিয়াকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলছেন রানা দাশগুপ্ত।তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপপ্রায়স আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। ব্যক্তির বক্তব্যকে পুঁজি করে সম্প্রদায় বিশেষকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর যে ঘৃণ্য অভিসন্ধি আমরা লক্ষ করেছি তা দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনক।

“এর মধ্যে গত ২১ জুলাই প্রিয়া সাহার কাছ থেকে ব্যাখ্যা জানার আগে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার পাশাপাশি তার পরিবারের জীবন ও সম্পদ রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা গোটা জাতিকে আশ্বস্ত করেছে।”

প্রিয়া সাহার ব্যাখ্যা না শুনে মামলা নয়: প্রধানমন্ত্রীর বরাতে কাদের  

সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যতন বন্ধ হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আগে যে রেঞ্জে ছিল তার থেকে কমতি ঠিকই আছে। কিন্তু আমরা তো বলেছি, নির্যাতনের ধারাটা অব্যাহত আছে।”

তবে বাংলাদেশ থেকে তিন কোটি ৭০ লাখ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোক ‘নিখোঁজ হয়েছেন’ বলে প্রিয়া সাহা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে যে তথ্য দিয়েছেন, তা দিয়ে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন সে বিষয়টি স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন পরিষদের এই নেতা।

“‘ডিজঅ্যাপিয়ার’ বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন তা তিনিই ভালো বলতে পারেন। এটি যদি স্বাধীন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের গুম বা নিখোঁজ অর্থে বলে থাকেন তবে তা অসত্য এবং আমরা তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।”

তবে অর্থনীতির অধ্যাপক আবুল বারকাতের গবেষণার তথ্য তুলে ধরে রানা দাশগুপ্ত বলেন, “গবেষণাগ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, শুধুমাত্র কুখ্যাত কালাকানুন শক্র (অর্পিত) সম্পত্তি আইনের ছোবলে ১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ দশকের মধ্যে এক কোটি ১৩ লাখ হিন্দু জনগোষ্ঠী হারিয়ে গেছে।”

সংগঠন থেকে প্রিয়া সাহাকে সাময়িক বহিষ্কারের কারার কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিডম হাউসের এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রিয়া সাহাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা আছে। কোনো কোনো মার্কিনী গণমাধ্যমে আমাকে সংগঠনের সভাপতি, প্রিয়া সাহাকে সাধারণ সম্পাদকের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমি পরিষদের সভাপতি নই।

“প্রিয়া সাহা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তার সাংগঠনিক পরিচিত নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির পরিপ্রেক্ষিতে এটিকে ‘সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ড’ বিবেচনায় স্থায়ী কমিটির জরুরি সভায় তাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়।”

প্রিয়া সাহা ঢাকায় ফিরলে তার বক্তব্য শুনে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলে জানান রানা দাশগুপ্ত।

সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্মল রোজারিও এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জীসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্রে বিডি নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :