ফুল নিলেন, জমা দিলেন অস্ত্র, এবার শান্তি ফিরবে সাগর উপকূলে

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:৩২ PM, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

ইমাম খাইর: বিভিন্ন ব্রান্ডের ১৫৫ টি অস্ত্র, ২৭৫ টি গুলিসহ সাগর উপকূলের ১২ বাহিনীর ৯৬ সদস্য আত্মসমর্পণ করেছে। সেখান শীর্ষস্থানীয় ১২ জন অস্ত্র তৈরীর কারিগরও রয়েছে।

শনিবার (২৩ নভেম্বর) সকাল সোয়া ১১ টার দিকে জেলা পুলিশের আয়োজনে ‘আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান’টি মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে ৯৫ জন তালিকাভুক্ত জলদস্যু, অবৈধ অস্ত্রধারী ও অস্ত্র তৈরীর কারিগরকে সেফহোম থেকে প্রিজন ভ্যানে করে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়।পুলিশ লাইন মসজিদের পেশ ইমাম আব্দুল মান্নানের কোরান তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়। প্রথমে আত্মসমর্পণকারীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়। এরপর স্বাগত বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন। জীবনের ভুল স্বীকার করে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সিরাজ বাহিনীর প্রধান সিরাজদৌল্লাহ। অভিশপ্ত জীবন থেকে ফিরে মুক্ত জীবনের চিত্র তুলে ধরেন ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর আত্মসমর্পণকারী জলদস্যু নুরুল আমিন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি বলেন, দেশের যেখানে যাই প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের চিত্র ভেসে আসে। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য নেত্রী ও মানুষের আস্থা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বদলে দিচ্ছেন বাংলাদেশ। কক্সবাজারের উন্নয়নে সমানতালে কাজ করছেন।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানেরর গেস্ট অব অনার আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে কোন জঙ্গি, সন্ত্রাসী, অপরাধীর স্থান হবেনা। যে কোন সময় ৯৯৯ নাম্বারে কল করে পুলিশের অনিয়মের বিরুদ্ধেও বলতে পারবেন। সে যেই হোক অপরাধীর ছাড় নেই।

পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন- কক্সবাজার -১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম, কক্সবাজার-২ (কুতুবদিয়া-মহেশখালী) আসনের সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক, কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান।

এছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন, মহেশখালীর ইউএনও জামিরুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আনোয়ার পাশা, মেয়র মকছুদ মিয়া, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরীফ বাদশা, জেলা কমিউনিটি পুলিশের সভাপতি সাংবাদিক তোফায়েল আহমদ, ওসি প্রভাষ চন্দ্র ধরসহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বিটিভির কক্সবাজার প্রতিনিধি জাহেদ সরওয়ার সোহেল।

কক্সবাজার জেলার সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় সক্রিয় জলদস্যু ও অস্ত্র তৈরীর কারিগরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা উপলক্ষ্যে ‘আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান’টির মধ্যস্থতা করেন আনন্দ টিভির চট্টগ্রাম ব্যুরো ইনচার্জ এমএম আকরাম হোসাইন। এই স্বীকৃতির জন্য তাকে সংবর্ধিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি। আত্মসমর্পণকারী প্রত্যেককে দেয়া হয়েছে ৫০ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান। অনুষ্ঠানের পর তাদের অস্ত্র আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, যুগযুগ ধরে যাদের খোঁজে প্রশাসনকে অভিযানের পর অভিযান চালাতে হয়েছে তারাই স্বেচ্ছায় প্রশাসনের হাতে ধরা দিয়েছে। যেটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। যাদের কারণে মহেশখালীর কালারমারছড়াসহ আশপাশের এলাকা অশান্ত থাকতো; গ্রুপিংয়ের কবলে পড়ে ঘটেছে অসংখ্য খুনের ঘটনা; ঝরেছে লাশ; জলদস্যুতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের খেসারত হিসেবে বছরের পর বছর ফেরারী জীবন কেটেছে, এমন লোকও আত্মসমর্পণ করেছে। তারা জীবনে আর অপরাধ করবে না বলে নিজের মাতৃভূমির মাটি ছুঁয়ে শপথ করেছে।

আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে রয়েছে – মানসম্মত অস্ত্র তৈরীর জন্য বিখ্যাত কারিগর জাফর আলম, মহেশখালীর কালারমারছড়ার আলোচিত জিয়া বাহিনীর প্রধান জিয়াউর রহমান জিয়া, তার বাহিনীর সদস্য মানিক, আয়াতুল্লাহ, আব্দুস শুকুর, সিরিপ মিয়া, একরাম ও বশিরসহ অন্তত ১৫ জন।
চেয়ারম্যান তারেক শরীফের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কালা জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর আলম, সদস্য আবুলু, সোনা মিয়া, জমির উদ্দীনসহ প্রায় ১৫ জন, নুনাছড়ির মাহমুদুল্লাহ বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ আলী, সেকেন্ড ইন কমান্ড বদাইয়াসহ ১৫ জন, ঝাপুয়ার সিরাজ বাহিনীর প্রধান সিরাজউদ্দৌল্লাহ, নলবিলার মুজিব বাহিনীর প্রধান মজিবুর রহমান প্রকাশ শেখ মুজিব এবং কুতুবদিয়ার লেমশীখালীর কালু বাহিনীর প্রধান মোঃ কালু প্রকাশ গুরা কালুসহ তার বাহিনীর ১৫/২০ জন।

গত জোট সরকারের আমলে জিয়াউর রহমান জিয়ার বাহিনী ও ছৈয়দ নূরের (নিহত) বাহিনীর মধ্যে প্রায় সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতো। তাদের গ্রুপিংয়ের শিকার হয়ে অন্তত ২০ জনের প্রাণ গেছে। ঘরছাড়া হয়েছে হাজারো যুবক। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জিয়া বাহিনীর সদস্যদের আধিপত্য অনেকটা কমে যায়।
তবে, অন্তঃকোন্দলের কারণে আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম চৌধুরী ও চেয়ারম্যান তারেকের তুমুল বিরোধ বন্ধ হয়নি। এই দুই ক্ষমতাশালী নেতার ছত্রছায়ায় রয়ে যায় অনেক দাগি অপরাধী। সম্প্রতি তাদের মধ্যকার সেই পুরনো বিরোধের বরফ গলতে শুরু করেছে। এই দুই জনের অনুসারী অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা আত্মসমর্পন করেছে। অশান্ত এলাকাটি এবার শান্ত হবে বলে আশা করছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর মহেশখালীতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদসহ ৪৩ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। সেখানে ৫ বাহিনীর ৩৭ জন এমএম আকরাম হোসাইনের মধ্যস্থতায় হয়েছে। তারা প্রতিজন ১ লক্ষ টাকা করে সরকারীভাবে আর্থিক অনুদান পেয়েছে। এরা সাবাই কারামুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। এছাড়া গত ১৬ ফেব্রুয়ারী ইয়াবা ও অস্ত্রসহ টেকনাফে আত্মসমর্পণ করে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি। সেটিও এমএম আকরাম হোসাইন মধ্যস্থতা করেন।

আপনার মতামত লিখুন :