কক্সবাজারে ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার দাবী জোরালো হচ্ছে

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:০২ PM, ১৮ জানুয়ারী ২০২০

নিজস্ব প্রতিবেদক::

শিক্ষার অগ্রগতি, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নসহ আরও বেশকিছু যৌক্তিক কারণ তুলে ধরে কক্সবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবীতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে কক্সবাজারের আপামর জনসাধারণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন ফোরামে এনিয়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা চলছে। সেই সাথে সচেতন মহলেও এর স্বপক্ষে জোরালো দাবী তুলতে দেখা গেছে। সর্বশেষ গত ১৬ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার মহান সংসদে দাঁড়িয়ে কক্সবাজারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী তুলেন কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সাংসদ জাফর আলম। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ভাষণের উপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই দাবী উত্থাপন করেন।

কক্সবাজারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবীতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে অনলাইন এক্টিভিস্ট রোমানা ইয়াসমিন পুতুলকে। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘কক্সবাজারে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চাই’ নামে একটি গ্রুপও চালু করেছেন। সেখানে প্রতিদিন সদস্য সংখ্যা বাড়ছে। দাবী আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে নিত্যনতুন মুখ। সবাই গ্রুপে যার যার মতো পোস্ট দিয়ে নিজেদের দাবীর কথা জানিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়াও তিনি কক্সবাজারের ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য সম্বলিত দাবীর কথা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সহকারে জানিয়েছেন এ প্রতিবেদককে। ‌‌‌‌‌‌‌তার দেওয়া সেই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পাঠকদের জন্য হুবুহু তুলে ধরা হলো-

‘নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের রাজধানী খ্যাত, পাহাড়, নদী ও সাগরে বেষ্টিত প্রকৃতির অপরূপ সাজে সাজানো বাংলাদেশের একমাত্র পর্যটন নগরী, পৃথিবীর দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালু কণাময় সৈকতের চোখ জোড়ানো এক মনোমুগ্ধকর শহর কক্সবাজার। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই কক্সবাজার বাংলাদেশের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল নিয়ামত। কক্সবাজারকে নিয়ে সরকারের অনেক মেগা পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে মেগা পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশের অনেক প্রকল্প দৃশ্যমান। এজন্য আমি বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সকলকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাবে কক্সবাজারে একটি সুপরিকল্পিত শহর গড়ে উঠছে না। অপরিকল্পিত ভাবে যেখানে সেখানে সরকারি ও বেসরকারিভাবে স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। পর্যটন শহর হিসেবে কক্সবাজারে সর্বপ্রথম প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী। যোগাযোগ ব্যবস্থার যৎ সামান্য অগ্রগতি দেখলেও শিক্ষার অগ্রগতি অদৃশ্যমান। উচ্চ শিক্ষার জন্য একমাত্র কক্সবাজার সরকারি কলেজই এ অঞ্চলের মানুষের একমাত্র ভরসা। আসন ও শিক্ষক স্বল্পতার কারণে এ অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যুগ যুগ ধরে।

এই শহরের প্রাকৃতিক সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এই দেশে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা অনায়াসে আয় করা সম্ভব। এজন্য দরকার আমাদের এক দক্ষ মানবগোষ্ঠী। দক্ষ মানবগোষ্ঠী তৈরির জন্য প্রয়োজন মনোরম পরিবেশে গবেষনা ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভূতাত্তি¡ক, সামুদ্রিক, মৎস্য, প্রাণী, বন ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে যারা পড়ালেখা করে তাদের জন্য গবেষণার চমৎকার স্থান হলো আমাদের কক্সবাজার।

কক্সবাজারের প্রধান দ্বীপসমূহঃ মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহপরি, সেন্টমার্টিন দ্বীপ (নারিকেল জিঞ্জিরা), মাতারবাড়ি।
কক্সবাজারের প্রধান নদীসমূহঃ মাতামুহুরি, বাকখালী, রেজু খাল, নাফ নদী, মহেশখালী প্রণালী এবং কুতুবদিয়া প্রণালী।

প্রধান বনসমূহঃ ফুলছড়ি রেঞ্জ, ভূমারিয়া-ঘোনা রেঞ্জ, মেহের-ঘোনা রেঞ্জ, বাঁকখালি রেঞ্জ।

প্রাকৃতিক সম্পদঃ কক্সবাজার সদরের নাজিরাটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সৈকতের বালিতে ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি দামের অন্তত ১৭ লাখ ৪০ হাজার টন খনিজ পদার্থ মজুত রয়েছে। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের (বিএইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. আনোয়ার হোসেন বলেছেন, সৈকত বালিতে মোট খনিজের প্রাক্কলিত মজুতের পরিমাণ ৪৪ লাখ (৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন) টন। প্রকৃত সমৃদ্ধ খনিজের পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন (এক দশমিক ৭৫ মিলিয়ন)। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে উচ্চ চাহিদাধর্মী মজুত আকরিক রফতানি করতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মূল্যবান খনিজ বালি জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট ও রুটাইল উত্তোলন করা যেতে পারে।

সুতরাং কোনো অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী কখনো প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও যত্ন নিতে পারে না। তাই এই শহরের জনগণকে শিক্ষিত হওয়া অতি প্রয়োজন। অথচ পরিসংখ্যান বলে, কক্সবাজারের শিক্ষার হার নয় বরং স্বাক্ষরতার হার মাত্র ৩৯%। ভাবা যায়, কক্সবাজারের মানুষ শিক্ষা দীক্ষার দিক দিয়ে কতটা পিছিয়ে?

কক্সবাজারের জনসংখ্যা প্রায় ২৩ লক্ষাধিক। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ৯৫০ জন। সর্বশেষ ২০১৫ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী- কক্সবাজারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১টি, মেডিকেল কলেজ রয়েছে ১টি, স্নাতকোত্তর কলেজ ২টি, কামিল মাদ্রাসা ৪টি, ডিগ্রি কলেজ ১১টি, ফাজিল মাদ্রাসা ১২টি, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ১৯টি, আলিম মাদ্রাসা ১৯টি, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ১টি। মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৪০টি, দাখিল মাদ্রাসা ১০৪টি, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৫২টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭০১টি।

জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেখলে সহজেই বুঝা যায়, জনসংখ্যার তুলনায় উচ্চ শিক্ষার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অতি নগণ্য। এই এলাকার শিক্ষার্থীদেরকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য পাড়ি জমাতে হয় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে।

এখানকার শিক্ষার্থীরা অনেক মেধাবী, তাই যারা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত তারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদস্থ পদে দায়িত্বরত আছেন। প্রতি বছর শতশত মেধাবী শিক্ষার্থী (বিশেষ করে মেয়েরা) দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েও পড়তে যেতে পারে না একমাত্র দূরত্ব, থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। এভাবে শতশত মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ডুবে যায় নীল সাগরের শ্রুতে।

কক্সবাজার তথা দক্ষিণাঞ্চলের জনগোষ্ঠী শিক্ষার দিক থেকে অনেক অনেক পিছিয়ে। শিক্ষার হার বাড়ানোর জন্য এখানে প্রয়োজন আরো অনেক প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মহাবিদ্যালয়। উচ্চ শিক্ষার জন্য এখানে নেই কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এতবড় একটা জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আমাদের কক্সবাজারে যদি বিশ্বমানের গবেষণা ভিত্তিক একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পদক্ষেপ নেয় তাহলে এখানকার শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে মেয়েরা শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে যাবে এবং জনসম্পদে পরিণত হয়ে দেশ ও জনগণের সেবা করার সুযোগ পাবে।

অনলাইন এক্টিভিস্ট মাহবুব নেওয়াজ মুন্না লিখেছেন- ‘রাগ হয়…। কক্সবাজারের মানুষ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবীতে এপর্যন্ত একবারও মানববন্ধন বা অন্যকোনো ন্যায্য কর্মসূচি পালন করেনি। তার মানে তাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দরকার নেই! মনে হয় তারা সন্তানদের অশিক্ষিত রাখতে চায়!! সারাজীবন এভাবে চুপ মেরে থাকলে একদিন চিৎকার করে গলা ফাটালেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পাবে না। তখন সবাই কপাল চাপড়াবে। একের পর এক পোস্ট দিয়ে এভাবেই নিজের ক্ষোভ এবং দাবীর কথা ফেসবুকে লিখে যাচ্ছেন তিনি।

যুব উদ্যোক্তা রিয়াজ মো. শাকিল জানান- কক্সবাজার আমার প্রাণ-আমার আবেগ। সুতরাং আমি চাই আমার ভবিষ্যত প্রজন্ম কক্সবাজারের আলো বাতাসেই বেড়ে উঠুক। এখানেই তারা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে আরোহন করুক। এছাড়াও দোরগোড়ায় উচ্চশিক্ষার সুব্যবস্থা থাকলে শহরের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে। নতুন করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, চাঁদপুরে হচ্ছে। তাহলে সম্ভাবনময় পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারেও একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হতে দোষ কোথায়। সবমিলিয়ে কক্সবাজারে একটি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবী।

কর্মজীবি আনোয়ারুল ইসলাম লাভলুর রয়েছে দুই কন্যা সন্তান। তাদের নিরাপদ উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কক্সবাজারে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী জানান তিনি। বছর দশেক আগে লাভলু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে টানে পরিবার নিয়ে কক্সবাজার চলে আসেন। এরপর থেকে কক্সবাজারকে ঘিরে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন তিনি। কিন্তু সন্তানাধির উচ্চ শিক্ষা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের মধ্যে একমাত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এবং কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ অনেক দীর্ঘ। কমপক্ষে ৫/৬ ঘন্টা বাসে চড়তে হয়। স্বল্প ব্যায়ের রেল যোগোযোগও নেই। পর্যটন রাজধানী হওয়ায় অনেক সময় বাসেও সংকট দেখা দেয়। এসময় যোগাযোগে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় জেলার বাহিরে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের। সুতরাং কক্সবাজারে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একইভাবে পর্যটন শহরের আলো বাতাস ও সৌন্দর্য্যকে ভালোবেসে কক্সবাজারেই কর্মজীবি হয়েছেন সৌরভ পান্ডে। তিনি এসেছেন রাজধানী ঢাকা থেকে। ইতিপূর্বে একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে কাজ করতেন। বর্তমানে একটি এনজিওতে কর্মরত আছেন। তিনি জানিয়েছেন- শুধুমাত্র কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে ভালোবেসে স্বপরিবারে কক্সবাজার পাড়ি জমিয়েছেন। এখানেই তিনি সন্তানদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চান। কক্সবাজারে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি প্রতিবেদককে জানান- সার্বিক বাস্তবতায় কক্সবাজারে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অবশ্যই যৌক্তিক দাবী। এই দাবী আরও আগে উঠা উচিত ছিলো। তবে খুব সম্ভবত এটি পাইপলাইনে রয়েছে। আমি যতটুকু জানি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবিষয়টি নজরে রেখেছেন।

আপনার মতামত লিখুন :