ঘুরেফিরে সিন্ডিকেটের হাতে দেশীয় লবণশিল্প, তিনমাসে ৪ লাখ ১২ হাজার ৭৫৭ মে. টন লবণ উৎপাদন

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৭:১১ PM, ০৫ মার্চ ২০২০

চ্যানেল কক্স:  ন্যায্যমূল্য সরাসরি মাঠ থেকে সরকারীভাবে লবণ ক্রয় করার কথা থাকলেও ঘুরেফিরে চিহ্নিত সিন্ডিকেটের হাতেই চলে যাচ্ছে দেশীয় লবণশিল্প। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি শিল্প গ্রুপের কর্তারা কক্সবাজার ঘুরে গেছেন। এতে করে সঠিক দামে লবণ বিক্রি করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রান্তিক চাষিরা। নুতন করে হতাশা ভর করছে এ শিল্পে সংশ্লিষ্টদের।

সুত্র মতে, মাঠ পর্যায়ের চাষিদের কাছ থেকে লবণ ক্রয়ের লক্ষ্যে ৯ দফা প্রস্তুাবনা দেন জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন।
গত ২১ জানুয়ারী শিল্পমন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাবনাটি পাঠানো হয়।
যেখানে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অবৈধভাবে আমদানিকৃত লবণের কারণে দেশীয় লবণ উৎপাদনে চাষিরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
লবণ উৎপাদনে চাষিদের উৎসাহিতকরণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিকের যৌথ সমন্বয়ে পরিদর্শনে চাষিদের লবণ উৎপাদনে উদ্ভুদ্ধকরণের প্রয়োজনয়ীতা তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক।
একইভাবে গত ২৪ ফেব্রুয়ারী বিসিকের পরিচালকের কাছে লবণের মূল্য বৃদ্ধি ও লবণ চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে লিখিতভাবে ৮টি প্রস্তাবনা পেশ করেন বিসিক কক্সবাজারের উপ-মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান।
প্রস্তাবনার মধ্যে লবণের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে মণপ্রতি কমপক্ষে ৩০০ টাকা করা দরকার বলে লিখেছেন।
এছাড়া জাতীয় লবণনীতি-২০১৬ এর আলোকে সরাসরি মাঠ পর্যায় হতে ন্যায্যমূল্যে অন্তত ১ লক্ষ মে. টন লবণ ক্রয় করে বাফার স্টকের ব্যবস্থা করার জন্য বাজেট ও অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রস্তাবনা দেন।
এদিকে, সরকারীভাবে লবণ ক্রয় করার পরিকল্পনাকে বাগিয়ে নিজেরা সুবিধা হাসিলের জন্য কিছু আমদানিকারক গ্রুপ তৎপর হয়ে উঠে বলে অভিযোগ মিলেছে।
চাষিদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন ও বিসিকের পরিকল্পনা অনুযায়ী সরাসরি মাঠ থেকে লবণ ক্রয় করলে কিছুটা হলেও দাম পাবে তারা। কিন্তু রাঘববোয়ালদের মাধ্যমে ক্রয় করতে মধ্যস্বত্বভোগিদের দৌরাত্ম্য বাড়বে। প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হবে চাষিরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজার লবণচাষি সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাইছার ইদ্রিস বলেন, কোন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লবণ ক্রয় করলে চাষিদের প্রকৃত দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরাসরি সরকারী প্রতিনিধিরা লবণ কিনলে সরকার নির্ধারিত দাম পাবে বলে মনে করছে চাষিরা।
আর, সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী ১ লাখ মে. টন লবণের বাফার স্টক গড়ে তুলার অহবান জানান লবণচাষি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরী।
তিনি বলেন, সরকারীভাবে মাঠ পর্যায়ের চাষাদের কাছ থেকে লবণ ক্রয় করার কথা শুনেছিলাম। দেখা যাক কি হয়।
তবে, কোন সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিলে প্রান্তিক চাষিরা প্রকৃত দাম পাবে কিনা- সন্দেহ সবার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মোল্লা সল্টের জিএম আবদুল মান্নান বলেন, পুরো বছর তাদের লবণ ক্রয়ের টার্গেট প্রায় দেড় লাখ মে. টন। গত ডিসেম্বর থেকে লবণ ক্রয় শুরু করেছে। সরকারী বাফার স্টকের জন্য নয়, নিজস্ব স্টক পুরণ করতেই তারা লবণ কিনছে। তিনি বলেন, মণপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে দালালদের কাছ থেকে তারা লবণ কিনে থাকে।
বিসিক কক্সবাজারের পরিদর্শক (উন্নয়ন) মো: ইদ্রিস আলীর দেয়া তথ্য মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত গত তিনমাসে জেলায় লবণ উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ১২ হাজার ৭৫৭ মে. টন। মণপ্রতি গড় মূল্য ১৬৩ টাকা। ২০১৯-২০ মৌসুমে দেশে লবণের চাহিদা ১৮.৪৯ লক্ষ মে. টন। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮.৫০ মে. টন।
কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলাতে ৬০ হাজার ৫৯৬ একর জমিতে লবণ উৎপাদিত হয়। এখানকার অধিকাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লবণের ওপর নির্ভরশীল। গত মৌসুমে ১৬ দশমিক ৫৭ লাখ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরীতে লবণের উৎপাদন ছিল ১৮ দশমিক ২৪ লাখ মেট্রিক টন। নভেম্বর থেকে মধ্য মে পর্যন্ত ছয় মাস লবণ উৎপাদিত হয়।
বিসিকের মতে, জেলায় লবণমিলের সংখ্যা প্রায় ৮০টি। সারাদেশে রয়েছে ২১৩টির মতো।
লবণ চাষি, ব্যবসায়ী ও মিলারদের অভিযোগ- পর্যাপ্ত লবণ মজুদের মাঝেও ৮ জনের শক্তিশালী সিন্ডিকেট সর্বদা তৎপর। বন্ডেড ওয়্যার হাউজ এর আওতায় ব্যাক টু ব্যাক এলসি এবং ট্যাক্স ফাঁকির মাধ্যমে ক্যামিকেল আইটেমের আড়ালে সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড (খাবার লবণ) আমদানী করছে। চাহিদার তুলনায় লবণের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে দেশীয় লবণ চাষীরা ন্যায্য মূল্য বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্থ। অন্যদিকে বিভিন্ন পন্থায় অবৈধভাবে লবণ আমদানী করায় সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব। শুধু একটি আমদানিচক্রের কারণে লবণ শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছে। যে লবণ শিল্প সারা দেশের চাহিদা মেঠাচ্ছে, সে লবণ শিল্প হুমকির সম্মুুখিন। চাষের প্রতি আগ্রহ কমে গেছে চাষিদের। মিলারেরা হতাশ ও দিশেহারা।
বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সংবাদ ও সংশ্লিষ্টদের সুত্রে জানা গেছে, ৮ সিন্ডিকেটে রয়েছে -মোল্লা, এসিআই, ফ্রেশ, তীর, খ্রিস্টাল, পুবালী, কনফিডেন্স ও মধুমতি।
এই বড় শিল্পগ্রুপগুলোর সাথে পেরে উঠছে না দেশী লবণশিল্প। ফ্রি ট্যাক্সে ‘ফিনিশ লবণ’ আমদানি করে তারা কম দামে বাজারে ছাড়ছে। যে কারণে মার খাচ্ছে স্থানীয় লবণ। এক সময় যারা জেলার একমাত্র লবণশিল্প নগরী ইসলামপুর থেকে লবণ ক্রয় করতো তারাও আজ বিমুখ। এখন আমদানি করতে হচ্ছে বাইর থেকে। ইসলামপুরকেন্দ্রিক বৃহৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ঢিমেতালে ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানসমূহ।

আপনার মতামত লিখুন :