১৫ মেট্রিক টন চাল আত্মসাৎ প্রমাণিত, আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার চেয়ারম্যান জাহেদ

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৫:৩২ PM, ৩০ এপ্রিল ২০২০

ইমাম খাইর, কক্সবাজার
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার আলোচিত ১৫ মেট্রিক টন সরকারি চাল আত্মসাতের ঘটনার সত্যতা পেয়েছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উল্লেখিত ১৫ মেট্রিক টন চাল গত ৩১ মার্চ করোনা ভাইরাসের কারণে গৃহবন্দি কর্মহীন অসহায় পরিবারের মাঝে বিতরণের জন্য টইটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর অনুকুলে উপ বরাদ্দ দেন উপজেলা প্রশাসন। পরবর্তীতে গত ৬ ও ৯ এপ্রিল দুইধাপে উল্লেখিত পরিমাণ চাল ডিও’র বিপরীতে চকরিয়ার চিরিঙ্গা খাদ্য গুদাম থেকে উত্তোলন করেন চেয়ারম্যান জাহেদ চৌধুরী।

এদিকে, জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বহিস্কারের পর এবার নিজ দল আওয়ামী লীগ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।

এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মজিবুর রহমান।

তিনি বলেন, দেশের চলমান করোনা ভাইরাস মহামারীতে সরকারি ত্রাণের চাল আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায় দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। ফলে সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে টৈটং শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে সাময়িক অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।

একই অপরাধে ২৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদ-১ শাখা এর উপ-সচিব মোহাম্মদ ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে টৈটং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব থেকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ মেট্রিক টন চাল উপ-বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তী বিতরণের মাস্টাররোল পেকুয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ে জমা দেয়ার নির্দেশনা থাকলেও অদ্যবদি জমা দেননি ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদ চৌধুরী। চাল আত্মসাতের ঘটনায় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো.কামাল হোসেন তদন্তের দায়িত্ব দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আবছারকে। গত ২৭ এপ্রিল তিনি সরেজমিনে পেকুয়া গিয়ে ঘটনাটি তদন্ত করেন। একইদিন বিকালে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে সরকারি ১৫ মেট্রিক টন চাল আত্মসাতের ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে গত ২৮ এপ্রিল রাতে পেকুয়া থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা (নং ০৪/২০২০) করেন পেকুয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো.আমিনুল ইসলাম।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন সুত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ শাখার ২৯.০৭.১৯ খ্রিস্টাব্দে ৫৬১ স্মারকে প্রবল বর্ষণ ও জোয়ারের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের মাঝে জিআর চাল বিতরণের জন্য ৪০ মে: টন বরাদ্দ দেন পেকুয়া উপজেলাকে। ওই বরাদ্দকৃত জি আর চাল হতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ২০ মে: টন: বরাদ্দ দেন টইটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদ চৌধুরীকে এবং পেকুয়া সদর ইউনিয়নে প্যানেল চেয়ারম্যান মাহাবুল করিমকে ৫ টন বরাদ্দ দেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবশিষ্ট থাকা ১৫ মেট্রিক টন চাল বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মহীন গৃহবন্দি অসহায় পরিবারের মাঝে বিতরণের জন্য গত ৩১ মার্চ, ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ৫১.০১.২২৫৬.০০০.৪১.০৬১.২০২০-৩০৮ নং স্মারকে টইটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর অনুকুলে উপ বরাদ্দ প্রদান করা হয় এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা পেকুয়াকে চাল বিতরণের মাস্টার রোল দাখিল অনুরোধ করা হয়। চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী বরাদ্দ পাওয়া ১৫ মে: টন ত্রাণের চাল চকরিয়া খাদ্য গুদাম থেকে দুইদাপে ০৬ ও ০৯ এপ্রিল নিজেই স্বাক্ষর করে উত্তোলন করেন।

উল্লেখিত ১৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণে জন্য ট্যাগ অফিসার হিসাবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্ত ছালামত উল্লাহকে প্রশাসনিকভাবে নিয়োগ দেন। কিন্তু পরবর্তীতে জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী উত্তোলনকৃত নিজ স্বাক্ষরে তোলা ১৫ মে: টন চাল বিতরণে ট্যাগ অফিসারকে কোন ধরণের অবহিত না করায় উপজেলা প্রশাসনের সন্দেহ প্রবণ হলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) লিখিতভাবে চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে ত্রাণের চাল বিতরণের মাস্টার রোল জমা করার জন্য পত্র প্রেরণ করেন। জাহেদ চৌধুরী মাস্টার রোল জমা দিতে কাল ক্ষেপন করায় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা চাল বিতরণ করেনি নিশ্চিত হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈকা সাহাদাতকে অবহিত করেন।

তিনি (ইউএনও) বিষয়টি জেলা প্রশাসককে বিধিমতে অবহিত করিলে জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন গত ২৭ এপ্রিল, ২০২০ খ্রিস্টাব্দে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আফসার সরেজমিনে পেকুয়া উপজেলায় গিয়ে তথ্য উপাত্ত ও ত্রাণে চাল বিতরণ না করার বিষয়ে অবগত এবং মাস্টার রোল জমা না দেওয়া সহ জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী চেয়ারম্যান, টইটং ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক ১৫ মে: টন ত্রাণের চাল আত্মসাৎ এর সত্যতার প্রমাণ মিলে। তিনি জেলা প্রশাসক বরাবরে ২৭ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে টইটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী ত্রাণের ১৫ মে: টন চাল আত্মসাৎ এর বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্দেশ দেন স্থানীয় সরকার বিভাগ কক্সবাজার এর উপ পরিচালক শ্রাবস্তী রায়কে ।

এরপর শ্রাবন্তী রায় গত ২৮ এপ্রিল ০৫.২০.২২০০.১২৬.০৫৯.২০২০-৩৪৯ স্মারকে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিনের চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী কর্তৃক ত্রাণের ১৫ মে: টন: চাল আত্মসাৎ এর বিষয়ের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অবগতি ও নির্দেশ প্রদান করেন কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুব আলমকে। তিনি (মাহবুব আলম) একই তারিখে ৫১.০১.২২০০.০০০.১৯.০১৪.২০.২৯৩ স্মারকে পেকুয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামকে লিখিত নির্দেশ দেন টইটং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম কর্তৃক ত্রাণের চাল আত্মসাৎ এর বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য।

স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক জনাব কামাল হোসেন এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জনাব আশরাফুল আফসার ও স্থানীয় সরকার এর উপ পরিচালক জনাব শ্রাবস্তী রায়সহ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকার্ত জনাব মাহবুব আলম এর নির্দেশ এবং প্রশাসনিক বিধিমোতাবেক গত ২৮এপ্রিল ২০২০ খ্রিস্টাব্দে সন্ধ্যায় টইটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৫ মে: টন: ত্রাণের চাল আত্মসাৎ এর অভিযোগে পেকুয়া থানায় ১৯৭৪ সনের ২৫ (১) ধারায় বিশেষ আইনে মামলা দায়ের করেন। পেকুয়া থানা পুলিশ মামলা রুজু করেন। যার নং-০৪/২০২০।

সূত্রে আরো প্রকাশ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আশরাফুল আফসার তদন্ত কালে জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে বক্তব্য নেওয়ার জন্য বরবার মোবাইল করেন মোবাইলে না পেয়ে স্ব-শরীরে তদন্ত টিমসহ টইটং ইউনিয়ন পরিষদে যান সেখানে জাহেদ চৌধুরীর খোঁজ না পাওয়ায় অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর ইউপি সচিব আবদুল আলিমথেকে ত্রাণের চাল আত্মসাৎ ও বিতরণের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে ইউপি সচিব এ বিষয়ে কিছুই জানেননা বলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে জানান।

স্থানীয় একাধিক জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল দাবি করেন, পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈকা সাহাদাত সরকারি বিধিমতে অসহায় পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার মাধ্যমে টইটং ইউপি চেয়ারম্যানকে ১৫ মে: টন চাল উপ বরাদ্দ দেন। মাস্টাররোল জমা না দেয়ায় প্রতিয়মান হয় যে, বরাদ্দ দেওয়া চাল আত্মসাৎ করেছেন চেয়ারম্যান জাহেদ চৌধুরী, সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিয়ম ও দুনীতি করেছে এমন প্রশ্ন থাকতে পারে না।

আপনার মতামত লিখুন :