শিশুশ্রম ও আমরা উন্নয়ন কর্মী মামুন নিলয় l সি কক্স নিউজ

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৯:৪৩ PM, ০১ মে ২০২০

নুরুল বশর উখিয়া।

এক সময় মানুষ গুহাবাসী ছিল। বনে জঙ্গলে পাহাড়ে পবের্ত ঘুরে বেড়াত খাদ্যের খোঁজে । সময়ের প্রয়োজনে হোক কিংবা বেঁচে থাকার তাগিদে হোক মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সভ্য হতে শুরু করে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে আমরা বাস করছি সভ্যতার সবোর্চ্চ চৌড়ায়। আধুনিক সভ্যতাকে তিলে তিলে গড়ে তুলতে যে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তা হলো দাসপ্রথা এবং শিশু শ্রম। কালে কালে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও আধুনিক সভ্যতার যে কালিমা এখনো জ্বলজ্বল করছে সেটি হলো শিশুশ্রম। শিল্পায়নে কম খরচে অধিক পণ্য উৎপাদন করতে সবর্প্রথম শিশুদের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেই থেকে শিশুশ্রম ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বব্যাপী। যা এখন অবধি চলছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ ও বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ১৮ বছরের চেয়ে কম বয়সী সব ছেলে এবং মেয়েকে শিশু হিসেবে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ কারখানা আইনে শিশুর বয়স ধরা হয়েছে ১৬ বছর। দোকান ও প্রতিষ্ঠান আইনে ১২ বছর, খনি আইনে ১৫ বছরের কম, চুক্তি আইনে ১৮ বছরের কম এবং শিশুশ্রম নিবন্ধক আইনে ১৫ বছরের নিচে সব ছেলে মেয়েকে শিশু হিসেবে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি শিশু শ্রমিক আছে। যে বয়সে আনন্দ, কোলাহল, খেলাধুলা করার কথা সেই বয়সে শিশুরা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। বই খাতা নিয়ে স্কুলে গিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন না দেখে এই শিশুরা সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে দুবেলা দুমুঠো খাবারের স্বপ্ন দেখে।

আন্তজাির্তক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর সবের্শষ প্রতিবেদন অনুসারে বতর্মান পৃথিবীতে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে। যে শিশু শ্রমিকরা প্রতিদিন তাদের শ্রম দেয় বিভিন্ন কাজে কিন্তু ঠিকমতো মজুরি পায় না, খাদ্য পায় না, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। সোনালী শৈশব কৈশোর হারিয়ে যায় বেঁচে থাকার তাগিদে।

২০১১ সালের এক সরকারি জরিপে জানা যায় আমাদের দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৭৯ লাখ। যার মধ্যে ১৫ লাখ শহরে এবং ৬৪ লাখ গ্রামাঞ্চলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। একাধিক তথ্য ও মাকির্ন শ্রমবিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী শিশু শ্রম ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান হলো দ্বিতীয়। যা আমাদের চলমান প্রকট শিশু শ্রমের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০১৩ অনুসারে দেশে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু শ্রমিক আছে। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমিক। শ্রম মন্ত্রণালয়ের মতে এই সংখ্যা ১৩ লাখ। প্রায় ৪৫টি ঝুঁকিপূণর্ কাজ শিশুরা করে থাকে। পরিসংখ্যান বিভাগের সর্বশেষ এক জরিপ অনুযায়ী দেশে মোট শিশুর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি। এর মধ্যে সব সেক্টর মিলিয়ে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি। যেসব সেক্টরে শিশুরা কাজ করে এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টেক্সটাইল, প্রিন্ট ও এমব্রয়ডারি, পোশাক শিল্প, চামড়া শিল্প, জুতার কারখানা, ইটভাটা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে বেশি শিশু কাজ করে কৃষিক্ষেত্রে এবং কলকারখানায়।

এ ছাড়াও শিশুরা হাটে-বাজারে, হোটেল রেস্টুরেন্টে, ওয়েল্ডিং, ওয়ার্কশপে কাজ করে। অনেক শিশু রিকশা-ভ্যান চলায়। শহর এলাকায় বিশেষ করে ঢাকা শহরের মাঝারি যানবাহনগুলোতে যেমন লেগুনা, টেম্পো ইত্যাদিতে ছোট ছোট শিশুরা কাজ করে। চলন্ত অবস্থায় ঝুঁকির মধ্যে যাত্রী ওঠানো, ভাড়া আদায় করে তারা। অনেকে লেদ মেশিন চালায়। বিড়ি ফ্যাক্টরিতে অনেক ঝুঁকির মধ্যে বিষাক্ত তামাক পাতা হাতে নিয়ে কাজ করে। তাছাড়া শিশুদের একটা বিশাল অংশ ফেলে দেয়া জিনিস পত্র কুড়িয়ে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেক শিশু বাসের হেলপার হয়। জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা সে হারে কমছে না বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই শিশুরা সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, বিনিময়ে ন্যায্য মজুরি পায় না। ঠিক মতো খেতে পারে না। প্রতিদিন তাদের সংগ্রাম চলতেই থাকে। এই শিশুদের স্বপ্ন হারিয়ে যায়। খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা তো পরের কথা, জীবনে বেঁচে থাকাই হয়ে ওঠে মুখ্য বিষয়। এই শিশুদের অনেকেই এতিম, কারো বাবা নেই, কারো মা নেই। কিংবা বাবা-মা থাকলেও দেখাশোনা বা খোজ খবর নেয় না। দারিদ্র্যতা, পারিবারিক বিচ্ছেদ, বাবা মায়ের বিচ্ছেদ, বাবা মায়ের পেশা, অভিভাবকের মৃত্যু, অনাকষর্ণীয় শিক্ষা ব্যবস্থাসহ প্রায় ২৫ টিরও অধিক কারণে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না। কেন এমন হচ্ছে? আমরা কি কখনো ভেবেছি তাদের কথা? সেসব ছোট ছোট শিশুর কথা? যাদের হাসি আনন্দে পৃথিবী ভরপুর হয়ে থাকার কথা ছিল।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে এতিমদের অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার নিশ্চিত করা। ১৭নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্র সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা দানের জন্য কাযর্কর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ২৮নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্র কোনো প্রকার বৈষম্য দেখাবে না। শিশুদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে রাষ্ট্রের অধিকার থাকবে।

তাছাড়া শিশু আইন ১৯৭৪ রয়েছে যেখানে শিশুদের তত্তাবধান, নিরাপত্তা ও আচরণ সংক্রান্ত বিধানাবলি প্রণয়ন ও প্রবতর্ন করা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখছি? ৩৪ লাখ শিশু শ্রমিক বেচে থাকার তাগিদে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র এই শিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না। আইন থাকলেও বিদ্যমান আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩২নং অনুচ্ছেদে বলা আছে।

জাতিসংঘে অংশগ্রহণকারী সব দেশ অর্থনৈতিক শোষণ থেকে শিশুর অধিকার রক্ষা করবে। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম অথার্ৎ স্বাস্থ্য বা শারীরিক, মানসিক, আত্বিক, নৈতিক, সামাজিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর অথবা শিশুর ব্যাঘাত ঘটায় অথবা বিপদ আশঙ্কা করে এমন কাজ যেন না হয় তার ব্যবস্থা নেবে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি শিশু অধিকার সনদের বাস্তবায়ন করতে পেরেছে? আমরা এখনও এটা করতে পারিনি। তাই আমাদের শিশুরা স্কুলে না গিয়ে

আপনার মতামত লিখুন :