দেশপ্রেমের চশমা… দুঃসময়ে দুস্থদের পাশে এনজিও নেই কেন? সি কক্স নিউজ

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:০৭ AM, ০৯ মে ২০২০
এনজিওর কার্যক্রম

সি কক্স ডেস্ক নিউজ:

স্বাধীনতার পর থেকে দেশে এনজিও কার্যক্রম শুরু হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিতে গরিব মানুষের জীবন যখন বিপর্যস্ত, সে সময় গরিব-দুঃখী মানুষকে সহায়তার নামে এনজিওরা এ দেশে কাজ করতে আসে। প্রথম প্রজন্মের এনজিওগুলো এ কারণে তাদের কার‌্যাবলি গরিব মানুষকে সহায়তা প্রদান এবং তাদের স্বাবলম্বী হতে স্বল্পসুদে ঋণদান কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখে।

কিন্তু সরকারি দূরদর্শিতার অভাবে ক্রমান্বয়ে এনজিওগুলো তাদের কর্মক্ষেত্রের পরিধি প্রসারিত করে। তারা ধীরে ধীরে নারী উন্নয়ন, শিক্ষা উন্নয়নের নামে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়। শিক্ষা বিস্তারের নামে নিজেরা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। আরও পরে এনজিওগুলো দুর্নীতি রোধে নারীদের আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য, গরিব মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ উন্নয়নের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করে তাদের কাজের আওতা বাড়ায়।

নতুন প্রজন্মের এনজিওরা দুর্নীতি প্রতিরোধ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, আদিবাসী উন্নয়ন, জেন্ডার, মিডিয়া, কর্মসংস্থান, গণতান্ত্রিক উন্নয়ন এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত এর কার্যক্রম প্রসারিত করে। তবে যেভাবে এনজিও কার্যক্রম প্রসারিত হয়েছে, সেভাবে কিন্তু গরিবের উন্নয়ন হয়নি। এনজিও পরিচালকদের অনেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও এনজিও কার্যক্রমের আওতাভুক্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠী ঋণ পেলেও সুদের টাকা শোধ করতে গিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারেননি। তবে গরিবের উন্নয়ন না হলেও এনজিওগুলো মুনাফা করে বড় হয়েছে। বেড়েছে তাদের কাজের পরিধি ও আওতা। সবকিছু মিলিয়ে দেশে এখন এনজিওগুলোর মিলনমেলা চলছে।

করোনায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গরিব দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, রিকশাওয়ালা, পরিবহন শ্রমিক, খুদে দোকানদার, কৃষক, শ্রমিক ও গরিব জনগোষ্ঠী। বড় এনজিওগুলো তো এদের উন্নয়নেই কাজ করে বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু এদের বিপদের দিনে, লকডাউনে এসব এনজিও কী করেছে, বা করছে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কিছু অর্থ দান করে ছবি তুলেই যদি এরা দায়িত্ব শেষ মনে করে, তাহলে সে ব্যাপারটি কতটা সমর্থন করা যায়? এসব বড় এনজিওর দেশব্যাপী শাখা অফিস আছে। আছে নিজস্ব জনবল। তারা প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে টাকা না দিয়ে যদি নিজস্ব জনবলের মাধ্যমে গরিবদের ত্রাণ দিত তাহলে ভালো হতো।

কারণ সরকারি ত্রাণ যেভাবে দলীয় চ্যানেলে বিতরণ করা হচ্ছে, তার মধ্যে যে অনেক আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে সেটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। এনজিওগুলো যদি নিজস্ব জনবলের মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রীসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে গরিব মানুষের পাশে দৃশ্যমান হতো তাহলে একদিকে যেমন চুরি-চামারি কমত, তেমনি অন্যদিকে নিম্ন আয়ের অভাবী মানুষগুলোরও এনজিওর প্রতি একটা ইতিবাচক ধারণা হতো। জনগণ খুশি হতেন যদি জানতেন, দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজ করা গ্রামীণ ব্যাংকসহ বড় এনজিওগুলো এ করোনা লকডাউনের দুঃসময়ে তাদের ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের কয়েক মাসের ঋণের সুদ মওকুফ করে দিয়েছে। বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে এবং সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে।

না, পত্র-পত্রিকায় বা আমাদের চারপাশে করোনায় গৃহবন্দি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ত্রাণ সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে এনজিওগুলোর তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি। আমি বলব না যে, কেউই এ কাজ করছেন না। ছোট ছোট অনেক এনজিও বা মিশনারি সংস্থাকে স্থানীয় পর্যায়ে ত্রাণ দিতে দেখা গেছে। তবে বড় এনজিওগুলোর সক্ষমতা অনেক বেশি।

এমন এনজিওগুলো ত্রাণকাজে দেশব্যাপী দৃশ্যমানভাবে নামলে জনগণ দুদিক থেকে লাভবান হতেন। প্রথমত, ত্রাণ পেয়ে এসব এনজিওর প্রতি জনগণের একটি ইতিবাচক ধারণা গড়ে উঠত এবং দ্বিতীয়ত, এদের কর্মকাণ্ড দেখে সরকারি ত্রাণ বিতরণে জড়িত জনপ্রতিনিধিরাও সতর্ক হয়ে এমন কাজে অধিকতর নিবিড়ভাবে সততার সঙ্গে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ হতেন।

এনজিওগুলোর প্রতি সাধারণ যেসব অভিযোগ রয়েছে তা তুলে ধরতে হলে প্রবন্ধ ছেড়ে গ্রন্থ লেখা যায়। তবে এনজিওর অনিয়মের ওপর যে কোনো কাজ হয়নি এমন নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নিজে এনজিও হয়েও এনজিও কর্মকাণ্ডের অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরে একাধিক কাজ করেছে। এ রকম দুটি কাজের উল্লেখ এখানে প্রণিধানযোগ্য। টিআইবির গবেষণা কর্মকর্তা সাধন কুমার দাস লিখিত একটি প্রতিবেদন ২০০৭ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয়।

এ গবেষণা কাজটির শিরোনাম ‘এনজিও খাতে সুশাসনের সমস্যা : উত্তরণের উপায়’। এটি একটি চমৎকার গবেষণা কাজ। এনজিও সেক্টরের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম গবেষক তথ্য-উপাত্ত সহকারে এ প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন। টিআইবি প্রকাশিত আরেকটি গবেষণার শিরোনাম ‘বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত এনজিও খাত : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়’। কতিপয় টিআইবি গবেষক ২০১৬-২০১৭ সালে ১৫টি স্থানীয়, ২৪টি জাতীয় এবং ৯টি আন্তর্জাতিক এনজিওর ওপর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে দ্বিতীয় গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করেন। এসব প্রতিবেদন পড়লে অনুধাবন করা যায়, এনজিও সেক্টরে সুশাসনের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় সংসদে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৩৩টি বিদেশি এনজিও রয়েছে। এসব এনজিওতে ৩৪২ জন বিদেশি এবং ১৫ হাজার ৮১৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক কর্মরত আছেন। এসব বিদেশি এনজিওর কার্যক্রম তদারকি করার মতো জনবল এনজিও ব্যুরোর নেই। ফলে এসব এনজিও তাদের মতো করে কাজ করে। অনেক সময় এমনও দেখা যায়, কোনো এনজিও তার ক্লায়েন্টের কাছ থেকে শতকরা ৪০ শতাংশ সুদ নেয়ার পরও সরকারকে ঠিকমতো কর দেয় না।

উল্লেখ্য, এনজিও ব্যুরোর বিধি অনুযায়ী একটি প্রকল্পের শতকরা ১৫ ভাগ টাকা প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য রেখে বাকি ৮৫ ভাগ টাকা প্রকল্পের কাজে ব্যয় করার কথা। অথচ অনেক এনজিও প্রকল্পের ৭০-৮০ ভাগ অর্থ পরিবহন এবং বিদেশি কর্মকর্তা উপদেষ্টাদের জন্য ব্যয় করে ফেলে। ফলে স্থানীয় কর্মচারীদের জন্য ব্যয় করার পর টার্গেট গ্রুপের জন্য ব্যয় করতে পারে ১০ ভাগেরও কম। ফলে যে টাকা দাতারা গরিবের উন্নয়নের জন্য প্রদান করেন, তার একটি বড় অংশ আবার পরোক্ষভাবে তাদের হাতেই চলে যায়।

তবে দারিদ্র্য বিমোচন করতে পারুক বা না পারুক, স্থানীয় রাজনীতিতে পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ। ভারতসহ অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিপক্বতার কারণে এনজিওগুলো স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটাতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশের এনজিওগুলোর গায়ে রাজনৈতিক রং লেগেছে অনেক বছর আগেই। এখানে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে পরোক্ষভাবে এনজিওগুলোর সমর্থন পেতে চায়। আর এ সুযোগে এনজিওগুলো রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।

সপ্তম সংসদ নির্বাচন থেকে বিষয়টি নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়। ওই নির্বাচনে এনজিও জোট ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। ফেমার ভোটার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম একটি বিশেষ দলের পক্ষে পরোক্ষভাবে পরিচালিত মর্মে অভিযোগ করা হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

বিষয়টি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স থেকে প্রকাশিত ‘গভর্নমেন্ট অ্যান্ড অপজিশন’ শীর্ষক গবেষণা জার্নালের ২০০০ সালের ৩য় সংখ্যার ৩৬৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত হয়েছে। ওই নির্বাচনে পরাজিত দলগুলো তাদের পরাজয়ের কারণ চিহ্নিত করার সময় অন্যান্য কারণের সঙ্গে নির্বাচন পর্যবেক্ষক এনজিওগুলোর তাদের দলের বিরুদ্ধে কাজ করার অভিযোগ করে। পরবর্তী অষ্টম সংসদ নির্বাচনে এ বিষয়ে সতর্কতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় দুটি দল থেকে বিশেষ বিশেষ নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী এনজিওর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে ওইসব এনজিওকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে না দেয়ার জন্য ইসিতে লিখিত অভিযোগ করা হয়।

একটি দেশের বড় এনজিওগুলো রাজনীতিতে পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেলে দারিদ্র্য বিমোচনসহ জনবান্ধব কর্মসূচির আবরণে তাদের সুপ্ত এজেন্ডা বাস্তবায়নে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কাজ করতে পারে। সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীতে মানুষ মারা গেলে তারা যেটুকু না করলেই নয়, ততটা কাজ করতে চায়। এ কারণেই হয়তো এ দেশের বড় এনজিওগুলো করোনার বিপদে গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াতে তাদের জনবল ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে দেশব্যাপী দৃশ্যমানভাবে কাজে নামেনি।

মনে রাখতে হবে, একটি সরকার যত দুর্বল হয়, সেখানে এনজিও কার্যক্রম হয় তত জোরালো। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান বাংলাদেশে এনজিও কার্যক্রম যথেষ্ট শক্তিশালী। আর এজন্যই বড় এনজিওগুলো করোনায় লকডাউনের দুঃসময়ে সর্বশক্তি নিয়ে দুস্থদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি মনে করছে না। এনজিও ব্যুরোকে শক্তিশালী করে এনজিওগুলোকে কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় না আনতে পারলে ক্রমান্বয়ে বড় এনজিওগুলো আরও শক্তি অর্জন করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার
অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :