• শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৭:০৫ পূর্বাহ্ন

বিশ্ব শিক্ষকদিবসে প্রিয় শিক্ষাগুরুকে নিয়ে ছাত্রের লিখা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২৫২ ভিউ টাইম
আপডেট : মঙ্গলবার, ৫ অক্টোবর, ২০২১

শিক্ষা জীবনে শিক্ষকের অবদান অনস্বীকার্য।বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের শিক্ষাদান সবার মানসপটে কম বেশী দাগ কেটে থাকে। আমার স্কুল জীবনে ও তেমনি সকল শিক্ষককে আমি ভালোবাসি।মা বাবার পরেই শিক্ষকের স্থান।মা বাবা আমাদেরকে জন্ম দিয়ে লালন পালন করেন। তেমনি শিক্ষকগণ ও আমাদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেন।কবির ভাষায় বলতে হয়,”মানব শিশু জন্ম নিলেই মানুষ কি আর হয়?মানব শিশু মানুষ করে মোদের বিদ্যালয়।” বিদ্যালয়ে আমাদের মানুষ করেন যারা তারাই শিক্ষক।আর এ শিক্ষকগণের মধ্যে কেউ কেউ তাদের কর্মকান্ড দিয়ে আমাদের প্রিয় হয়ে উঠেন।তেমনি আমার ও একজন খুবই প্রিয় শিক্ষাগুরু আছেন।

আমার সুযোগ হয়েছিল দক্ষিণ চট্রগ্রামের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাগুরু ও নারী শিক্ষার অগ্রদূত চৌধরী মোহাম্মদ তৈয়ব হুজুরের সান্নিধ্য পাওয়ার। তিনি একাধারে কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতন, কিশল আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মিলেনিয়াম স্কলার্স সহ অনেক গুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষাগুরু।

প্রথম সাক্ষাৎঃ
———————
মাত্র আট বছর বয়স আমার, আমাদের গ্রামের আশে পাশেও কোন ভাল মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলনা অন্যদিকে আমাদের নিয়মিত স্কুলে আনা-নেওয়া ছিল একটা দুঃচিন্তার কারণ। তাই আম্মু ঠিক করল আমাকে হোষ্টেল আছে এমন স্কুলে ভর্তি করাবে। তখন সময়টা ছিলা ২০০৮ সালের জানুয়ারির সকাল বেলা, আম্মু আমাকে নিয়ে গেল তৈয়ব হুজুরের স্কুলে, আম্মু আমাদের স্কুলে ভর্তির বিষয়ে সব তথ্য দিলেন এবং অনুরোধ করলেন আমাকে হোষ্টেলে রাখতে কিন্তু তৈয়ব হুজর জানিয়ে দিলেন এত পিচ্ছি ছেলেকে হোষ্টেলে রাখা যাবে না, পরে অনেক রিকুয়েষ্ট করে আমার বড় আপুকে গালর্স স্কলের হোষ্টলে ভর্তি করিয়ে আপু আমার দেখাশুনা করবে এমন শর্তে অনুমতি দেয়।

শুরু হল আমার নতুন জীবনের পথ চলা। ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু রাত ১১টা ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটা মুহূর্ত ছিল হুজুরের নিয়ন্তনে। নামাজের দোয়া শিখা,কোরআন শিখা,স্কুল ড্রেস মেইনটেইন করা, টাইলি এসেম্বলিত যাওয়া, ক্লাসে জয়েন করা আবার রাত ১০টা পর্যন্ত পড়ালেখা করে সব পড়া আদায় করতে পারলে মিলত ঘুমাতে যাওয়ার পারমিশন। পুরো সময়টা ছিল একপ্রকার কারাগারের মত চার দেওয়ালে বন্দি থাকার মত ছিলাম।ওনাকে দেখলে মনে হত ওনার মনে কোন দয়া মায়া নেই, আসলে তা নয় ওনি অনেক আন্তরিক ও ছিলেন।

আমাদের বিনোদনের জন্য অনেক ধরনের খেলনা সামগ্রীর ব্যাবস্থা করে দেন হুজুর। সাপ্তাহে শুক্রবার আসলে আমাদের ওনার সাথে গুরতে নিয়ে যেতেন।
সবার ছোট হিসেবে হুজুর আমাকে অনেক স্নেহ করতেন, হুজুরের স্নেহ পেয়ে আমার তাকে আইডল মনে হতো।

আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। পড়ালেখা আমার খুব কঠিণ মনে হতো। ঠিক মত লিখতেও পারতাম না। তখন সবার শেষের রোল নাম্বারটা ছিল আমার। হুজুরের ক্লাস আমাদের ছিল না কিন্তু ক্লাসে কোন স্যার আসতে দেরি করলেই হুজুর চলে আসত।সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে আমাদের প্রাথমিক শাখা মিলেনিয়াম স্কলার্সে তিনশত শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সবাইকে চিনত তৈয়ব হুজুর এবং সবার নামও জানতেন।
স্কুল শেষে বিকেল বেলা তিনি আমাদের খুব সুন্দর করে যোগ, বিয়োগ, বুঝিয়ে দিতেন এবং হাতের লিখা শিখাতেন। যে আমার কাছে কঠিণ বিষয়টি খুব সহজ হয়ে উঠলো।গাণিতিক সমস্যা,ইংরেজি সব কিছুই উনি এত সহজে বুঝাতেন যে আমি খুব ভালো ফলাফল করতে শুরু করি।আলহামদুলিল্লাহ,তার ধারাবাহিকতা আজও বজায় আছে। তিনি আবার আমাদের মাঝে গল্পও শোনাতেন।

আর তিনি আস্তে আস্তে আমার প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেন।(যদিও তখন এত কিছু বুঝতামনা,তার স্নেহই তাকে আমার প্রিয় শিক্ষকের তালিকায় নিয়ে আসে)।

২০০৮ থেকে ২০১১ সালের প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে স্বরণীয়, সবচেয়ে আনন্দ লাগত দুই থেকে তিন মাস পর পর কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে যাওয়ার ছুটি পাওয়ার সময়। তাছাড়া প্রতি সাপ্তাহে আম্মু এসে আমাদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে দিতেন।
একবার অনেক লম্বা সময় হোষ্টেল বন্ধ দেয়নি, বাড়িতে যাওার অনেক ইচ্ছে কিন্তু কোনভাবেই সুযোগ পাচ্ছিলাম না, এদিকে আমার বাক্সে জমাকৃত সব নাস্তাও শেষ হওয়ার পথে। তাই ঠিক করলাম পালাব, কিন্তু পালানোর অভিজ্ঞতা ত আমার ছিল না তাছাড়া হাতে ত টাকা ও রাখার কোন অনুমতি ছিল না, তাই অনাবাসিকে থাকা আমার এক মামাত ভাই থেকে পরামর্শ নিলাম সে আমাকে দশ টাকা ম্যানজ করে দিল আর কিভাবে যাব তা-ও জানিয়ে দিল। স্কুল ছুটির পর বেরিয়ে গেলাম স্কুল ড্রেস পড়ে, ষ্টেশনে গিয়ে রাস্তা পার হব ঠিক ওই মুহূর্তে হুজুর আমাকে দেখে ফেলল। আমি অনেক আতঙ্কিত হয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম আজ আর রেহাই নেই বাঘের হাত থেকে।

হুজুর আমাকে হাত ধরে অফিসে নিয়ে গেল, গিয়ে ওনি যা করল তা দেখেই আমি পুরো হতবাগ হয়ে গেলাম। ওনি আমাকে অনেক ধরনের নাস্তা ও খাওয়াল আমাকে, দুপুরে ওনার সাথে খাবার খাওয়ার পর ওনি আমাকে বলল তুমার কি সমস্যা আমাকে বল। তখন বাড়ি যাওার ইচ্ছের কথা জানালাম ভয়ে ভয়ে। হুজুর আম্মুকে কল দিল আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, সাথে তিন দিনের ছুটি।
আম্মুকে বলল আমাকে এই তিনদিন ঘুরতে নিয়ে যেতে।
এই দিনটা আমার কাছে চিরস্বরণীয় হয়ে থাকবে কারণ হুজুরকে ওমনটা আআন্তরিক হতে আর কখনোই দেখিনি। এভাবেই কাঠিয়ে গেক চারটি বছর। পরে হুজুরের মিলেনিয়াম থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলাম অন্য স্কুলের হোষ্টেলে।

তৈয়ব হুজুর এখন আর শিক্ষকতা করেন না। তিনি অবসরে চলে গেছেন। হুজুরের হাতেগড়া প্রতিষ্ঠান গুলোকে ঝড়ের কবলে পড়ে কালের গর্ভে হয়তো একদিন বিলীন হয়ে যেতে পারে ।কিন্তু এ জাতির জীবনে তৈয়ব হুজুরের মত শিক্ষকদের খুব প্রয়োজন।যারা নিজেদের বিলিয়ে গড়েন স্বপ্নের ইমারত।শেখান শৌখিন জীবনের মারপ্যাঁচে মাথা উঁচু কর চলার মূলমন্ত্র।আমার শ্রদ্ধার আসনে বেঁচে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তর আমাদের শিক্ষাগুরু তৈয়ব হুজুর ।

তারেকুর রহমান
মিপ্রাস২০১১
কিপ্রাস ২০১৭


আরো বিভন্ন বিভাগের নিউজ