• শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন

গুরুত্বপূর্ণ পদে উপাচার্যের ১৩ আত্মীয়, বিএনপি-জামায়াতের ১৭ জন নিয়োগ

ডেস্ক নিউজ / ২৩৬ ভিউ টাইম
আপডেট : শনিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২১

নতুন প্রতিষ্ঠিত সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি এখনো। নেই স্থায়ী কোনো ভবন বা অবকাঠামো। শুরু হয়নি পাঠদান। নগরের চৌহাট্টা এলাকায় সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের আঙিনায় অস্থায়ী অফিসে চলছে দাপ্তরিক কাজ। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৭৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে উপাচার্যের ১৩ আত্মীয়কে বসানো হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদে। নিয়োগ পেয়েছেন জামায়াত-শিবিরের লোকজনও।

দেশের চতুর্থ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০১৮ সালের অক্টোবরে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ওই বছরের ১৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে নিয়োগ পান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সাবেক কর্মকর্তা নঈমুল হক চৌধুরী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বড় অংশকেই অস্থায়ী (অ্যাডহক) ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে টাকা লেনদেন, আত্মীয়করণের অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়োগের বিষয়ে যাতে চাপে পড়তে না হয় সে জন্য রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বজনদেরও চাকরি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকের একাধিক সাংবাদিকের আত্মীয়-স্বজনও চাকরি পেয়েছেন; যাঁদের অনেকের ওই সব পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে উপাচার্যের ১৩ আত্মীয়কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন শ্যালক নাহিদ গাজীর স্ত্রী ফাহিমা আক্তার মনিও। উপাচার্যের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় হিসেবে সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা) পদে নিয়োগ পেয়েছেন শাবিপ্রবির সাবেক শিবিরকর্মী সরোয়ার আহমদ।

উপাচার্য মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নঈমুল হক চৌধুরী দুজনেরই গ্রামের বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে। শাবিপ্রবিতে নঈমুল জামায়াতপন্থী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ২০১৭ সালে বিএনপি-জামায়াতপন্থী প্যানেল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী পরিষদ’ থেকে অফিসার্স সমিতির নির্বাচনও করেছেন। তিনি উপাচার্যের প্রশ্রয়ে নিজের মতাদর্শের লোকদেরও কৌশলে এখানে নিয়োগ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের ভাগ্নে রহমত আলী, মামাতো ভাই মোনাল চৌধুরীকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে, অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদে ছাত্রশিবিরের সিলেট মহানগর শাখার সদস্য আলমগীর, দেলোয়ার ও ফারুকী এবং সদর উপজেলা শিবিরের সাবেক নেতা সাফওয়ান আহমদকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উপসহকারী প্রকৌশলী পদে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি) শিবিরের সাথি আশরাফ হোসেন এবং সেকশন অফিসার হিসেবে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরকর্মী বেলাল উদ্দিন নিয়োগ পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি হারিছ চৌধুরীর আত্মীয় বেলাল চৌধুরীসহ বিএনপি-জামায়াতের মোট ১৭ জন নিয়োগ পেয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নঈমুল হক চৌধুরী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কি না, এ বিষয়টি তাঁর জানা নেই মন্তব্য করে উপাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তা ছাড়া তিনি ঠিক রেজিস্ট্রারও নন, ফিন্যান্স ডিরেক্টর।’ নিজ দলের লোকজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে সুবিধা দিচ্ছেন নঈমুল—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিপুলসংখ্যক লোকবল নিয়োগে লেনদেন ও অনিয়মের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘এসব অভিযোগ সঠিক নয়। তা ছাড়া যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এর বেশির ভাগ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। কর্মকর্তার সংখ্যা খুব বেশি নয়।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান শুরুর আগে এত জনবল নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দাপ্তরিক কাজ, সাইড দেখাশোনাসহ নানা কাজের জন্য তো লোক লাগে।’ নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অ্যাডহকে লোকজন নেওয়া হলেও নিয়ম মেনে অনেকের চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে। বাকিদেরও হবে।’ সিন্ডিকেটে বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে বলেন, ‘স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া শুরুর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। পরে প্রক্রিয়া মেনেই স্থায়ী করা হবে।’

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কৌশল

অনুসন্ধানে জানা যায়, উেকাচের মাধ্যমে নিয়োগ দিতে কৌশল নেন উপাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পদের বিপরীতে শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের সুবিধা করে দিতে গত ১০ জানুয়ারি ছয়জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে একই কৌশল নেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার কলামে লেখা ছিল ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহাট্টাস্থ অস্থায়ী ক্যাম্পাসে সরাসরি নিজে/প্রতিনিধির মাধ্যমে যোগাযোগ করে যোগ্যতাসংবলিত তথ্য সংগ্রহ করা যাবে।’ চলতি বছর আরো তিনটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও এভাবে নানা কৌশল নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫ জুলাই প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে একজন করে সহকারী রেজিস্ট্রার ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে সর্বনিম্ন বয়স ৩৭ বছর উল্লেখ করা হয়। পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দিতে এই বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই বিজ্ঞপ্তিতে একজন করে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও উপসহকারী প্রকৌশলী পদের জন্য বয়সসীমা অনূর্ধ্ব ৩০ বছর ছিল। ২৬ জুলাই বিজ্ঞপ্তিতে উপপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদের সর্বনিম্ন বয়স ৪২ বছর উল্লেখ করা হয়। এ অভিযোগ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘সিন্ডিকেটের অনুমোদন নিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। ইচ্ছামতো কিছু করা হয়নি।’

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ

গত ২২ অক্টোবর সিলেট নগরের পার্কভিউ হাসপাতালে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সেকশন অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার আগে পছন্দের প্রার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। স্থায়ী নিয়োগের এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সেকশন অফিসার পদে আটজন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে ৯ জন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগেই পেয়ে যান। এ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ কেউ করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’

নিয়োগ পাওয়া অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ

নিয়োগ পাওয়া অনেকের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা আব্দুস সবুরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অ্যাডহক ভিত্তিতে এ ধরনের নিয়োগ অবৈধ বলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সূত্রে জানা গেছে। আব্দুস সবুর ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে উপাচার্যের আরো ১২ আত্মীয় নিয়োগ পেয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া একজনের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ১.৬০, যা তৃতীয় শ্রেণির সমমর্যাদার। নিয়োগবিধি অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি পাওয়া কাউকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো অনেকের নিয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যোগ্যতা শিথিল করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অনেককে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের যোগ্যতা উল্লেখের নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম চালুর আগেই বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। সিলেটের শাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থী প্রায় ১০ হাজার। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা আছেন ২৬৪ জন। অন্যদিকে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী ও ১৪৯ জন কর্মকর্তা আছেন সিকৃবিতে। অথচ সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান ও তেমন কার্যক্রম শুরুর আগেই ১৭৮ জনকে নিয়োগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তদন্ত কমিটি সিলেটে

এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ঢাকা থেকে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সিলেটে এসে গত সোম ও মঙ্গলবার কাজ করেছে। দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অতিরিক্ত সচিব (আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অডিট অনুবিভাগ) মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নঈমুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সোম ও মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল ধরেননি।

উল্লেখ্য, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমানের প্রস্তাবে সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়’ নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় সিন্ডিকেট সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।


আরো বিভন্ন বিভাগের নিউজ