সৈকতের বালিয়াড়িতে দ্বিতীয় দফায় উচ্ছেদ অভিযান, রয়ে গেছে নেপথ্য কাহিনী

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৮:১০ PM, ১১ জুন ২০১৯

ইমাম খাইর, সিবিএনঃ
বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ি দখল করে নির্মিত অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদে দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার (১১ জুন) দুপুরে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পর্যটন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয়ের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়।
বিকাল ৫ টা পর্যন্ত ২২ টির মতো স্থাপনা সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে ৮ জুন প্রথম দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালায় প্রশাসন।
অভিযান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম জয় বলেছেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সৈকতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বালুচরের শ্রীহীন এবং অবৈধ স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রশাসনের অগোচরে কিছু ব্যক্তি বালিয়াড়ি দখল করে অবৈধভাবে দোকানপাট করার চেষ্টা করেছিল।  অভিযোগ পেয়ে স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছে, সরকারি দলের নাম ব্যবহার করে কিছু দখলবাজ প্রকৃতির লোক সৈকতের বালিয়াড়িতে মার্কেট নির্মাণ করে আসছিল। দোকানের প্রলোভনে অনেকের কাছ থেকে এক থেকে দুই লাখ পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে একটি সিন্ডিকেট।

দখলের নেপথ্য কাহিনি ও কার্ড বাণিজ্যঃ
কক্সবাজার সুগন্ধা বীচের বালিয়াড়িতে সরকারি জমি দখল করে দোকানপাট নির্মাণের ব্যাপারটা কমবেশি সবারই জানা।
তবে, দোকানগুলোর প্রকৃতপক্ষে মালিক কারা? দোকান বরাদ্দের নামে কি পরিমাণ টাকা আদায় করা হয়েছে? কাদের হাতে টাকার ভাগ যায়? তা অনেকেরই জানা নাই। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসবের অজানা কাহিনী।
জানা গেছে, বিগত ২০০৭ সালের দিকে মাত্র ৮-১০ জন হতদরিদ্র ও ক্ষুদ্র ঝিনুক ব্যবসায়ীকে অস্থায়ীভিক্তিতে নামমাত্র মূল্যে কার্ড প্রদান করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক।
কয়েক বছর পর কার্ড তথা দোকানের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৩০টির মতো করে জেলা প্রশাসন। প্রতি কার্ডের ফি নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার টাকা।
এমতাবস্থায় সুগন্ধা বীচের বালিয়াড়িতে দোকানের সংখ্যা প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশত হয়ে যায়। কার্ডের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪০০।
অবাক করা বিষয় হলো, জেলা প্রশাসন নির্ধারিত ৮ হাজার টাকার স্থলে প্রতি কার্ড বাবদ হকারদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে তিন থেকে চার লক্ষ টাকা। এসব দোকান কেন্দ্রিক গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
যাতে জেলা প্রশাসনের একজন কর্মচারী সরাসরি জড়িত বলে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর মুখে অভিযোগ শোনা গেছে।
ওই চিহ্নিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কার্ডগুলো ২য় ব্যাক্তিকে বিক্রি করছে সাত থেকে আট লাক্ষ টাকায়। এমনও রয়েছে, একটি দোকান থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে দখলবাজ চক্রটি। যা হয়তো জেলা প্রশাসনের কেউ জানে না।
আরো অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, তৎকালীন জেলা প্রশাসন অসহায় হতদরিদ্র ঝিনুক ব্যবসায়ীদের দোকানগুলো বরাদ্দ দিলেও বর্তমান পরিস্থিতি তার উল্টো।
এখন যাদের নামে দোকানের কার্ড আছে তারা প্রত্যেকেই সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও সাবলম্বী ব্যক্তি। প্রকৃত ঝিনুক ব্যবসায়ী দোকানের মালিক নয়। রাঘববোয়ালরা দোকানগুলোর মালিক।
৯ জুন সরেজমিনে খোঁজখবর নিতে গেলে এসব তথ্য উঠে আসে। বের হয় আরো অজানা কাহিনী।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানায়, সুগন্ধা বীচ ঝিনুক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. রুবেল, সুগন্ধা বীচ ঝিনুক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকের হোসেন, যুবদল নেতা জয়নাল, নুরুল হুদা, সী-গাল পয়েন্টস্থ ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি জালাল ও অপর ব্যবসায়ী লালুর নেতৃত্বে ঈদের ছুটিতে রাতের অন্ধকারে সুগন্ধা পয়েন্টের দু’পাশে অর্ধশতাধিক দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এদের নেতৃত্বে গত দুই ঈদের রাতে মার্কেট নির্মাণ করা হয়। এবারও তাদের নেতৃত্বে দু’পাশে অর্ধশতাধিক দোকান নির্মাণ করা হয় ঈদুল ফিতরের আগের রাতে ও পরের রাতে। এতে প্রতিটি দোকান থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত।
সরেজমিন সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, নতুন করে উত্তর পাশে ২৪ টি দোকান এবং পূর্ব পাশের মার্কেটের ভিতরে প্রতি গলিতে একটি করে মোট ৭ টি দোকান নির্মাণ হয়।
ঈদের ছুটিতে দখলবাজরা তড়িঘড়ি করে রাতারাতি নির্মাণ কাজ চালায়। এসব নিউজ বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যম ও ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে ভাইরাল হয়। পরে প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান চালায়।
পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজেষ্ট্রিট সাইফুল ইসলাম জয়ের নেতৃত্বে অভিযানে উত্তর পাশের কিছু দোকান ভাঙ্গা হলেও পূর্ব পাশের দোকানগুলোতে হাত দেয়া হয়নি। রয়ে যায় অক্ষত।
সমুদ্র নগরীর বাসিন্দারা বলছে, পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় সুগন্ধা পয়েন্টে ডেসটিনি গ্রুপের বহুতল ভবন নির্মাণ বন্ধ করে দেয় হাইকোর্ট।
অথচ বালিয়াড়ি দখল করে অবাধে স্থাপনা নির্মাণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে দখলবাজ একটি চক্র।
বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামানোর কথা। কিন্তু তারা নিরব কেন? প্রশ্ন স্থানীয়দের।
সুগন্ধা বীচ মার্কেটের কয়েক জনের (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) কথা বলে জানা যায়, মার্কেটের কার্ডহোল্ডার জাকিরের সাথে ডিসি অফিসের পর্যটন ডেস্কের অফিস সহকারী উত্তম বাবু সাথে ভালো খাতির রয়েছে। দুই জনের লিয়াজুতেই টাকার পরিমাণের ভিত্তিতে কার্ড ইস্যু করে।
তাছাড়া সুগন্ধা বীচ মার্কেটের একাধিক কমিটি থাকায় তাদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষমূলক আচরণের প্রেক্ষিতে মার্কেটে নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের প্রতিযোগিতা চলছে।
সুগন্ধা বীচ ফটকের পাশে পর্যটকদের চলাচলের পথ ব্যাঘাত সৃষ্টি করে নতুন করে আরো চারটি দোকান নির্মিত হচ্ছে। উচ্ছেদকৃত দোকানগুলো পুনঃনির্মাণের ফন্দি আঁটছে দখলবাজরা।
এই প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ঈদের আগের ও পরের রাতে বালিয়াড়িতে মার্কেট নির্মাণের বিষয়টি কেউ আমাকে অবগতও করেনি। বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শনিবার সকালে জানতে পারেছি। সাথে সাথে দুপুরের মধ্যে লম্বা একটি নির্মাণাধীন মার্কেট উচ্ছেদ করা হয়েছে। সোমবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। কথা বলেছি স্থানীয়দের সাথে।
ডিসি বলেন, অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এবিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভিক্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন :