একজন হোবাইব ও তার আজন্ম পাপ | সি কক্স নিউজ

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৩:৪৫ PM, ১২ মে ২০২০

স.ম.ইকবাল বাহার চৌধুরী:

১৯৯৯ সালের কথা। সে সময় মহেশখালী উপজেলার কালারমার ছড়া আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার ইংরেজী শিক্ষক আমি। বাড়ী একটু দুরে হওয়ার সুবাদে কালারমার ছড়া মোহাম্মদ শাহ ঘোনা গ্রামেই লজিং থাকতে হয়। লাজুক ও চঞ্চল চরিত্রের হোবাইব ছিলেন ওই এলাকার তৎকালিন জমিদারের নাতি।

সে সময় ৭/৮ বছরের চঞ্চল এক শিশু মাদ্রাসায় যেত। ঠিক মনে নেই, সে সময় হয়তো ২য়/৩য় শ্রেণির ছাত্র ছিল। তার চঞ্চল স্বভাবের কারনে অনেকের কাছে অপ্রিয় হলেও আমার কাছে খুবই প্রিয় ছিল। তখন কিন্তু ঢাকার সাপ্তাহিক অপরাধ চিহ্ন ও সাপ্তাহিক আজকের সুর্যদয় পত্রিকায় নিউজও করতাম। তখন অনেক ভাল শিক্ষকদের কাছে শুনতাম, কোন ছেলে ছোট বয়সে চঞ্চল আর দুষ্ট হলে বুঝতে হবে তার ভিতরে প্রতিভা লুকায়িত আছে। তাকে নার্সিং করলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। তাই আমি শিশুদের চঞ্চলতা আর দুষ্টুমিকে পছন্দ করতাম এবং এখনো করি। সেই থেকে সে শিশুটি কেন জানি ভয়ে হোক আর যাই হোক আমাকে সামনে পেলে স্যার বলে সালাম দিয়ে লক্ষি ছেলের মতো পাস কেটে যেত।

গত ২০০০ সালে আমি সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে কালারমারছড়া মইনুল ইসলাম সিনিয়র মাদ্রাসায় যোগ দিলাম। সেই থেকে আর চঞ্চল শিশুটির দেখা হয়নি দীর্ঘ দিন ধরে। হঠাৎ ২০১১ সালের দিকে সে কোথায় যেন আমাকে দেখে কদমবুছি করে সালাম দিয়ে বলল, স্যার আমাকে চিনছেন? আমি অনেকক্ষন তার দিকে তাকিয়ে বললাম নাতো! সে বললো স্যার আমি হোবাইব! কালারমারছড়া মোহাম্মদ শাহ ঘোনা গ্রামের। তখনই আমি ফিরে পেলাম স্মৃতি। এ ১১/১২ বছরে কত বড় হয়ে গেছে ছোট্ট চঞ্চল সেই শিশুটি। এর পর কথায় কথায় জানতে পারলাম সেও এখন সাংবাদিকতা করে কক্সবাজারের আজকের কক্সবাজার বার্তা পত্রিকায়।
এখন সে নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে অনেক দূর এগিয়ে কাজ করেন এখন চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পূর্বকোণ, অঞ্চলভিত্তিক জনপ্রিয় সিপ্লাস টিভি, স্যাটেলাইট টেলিভিশন বিজয় টিভি ও দৈনিক আমাদের কক্সবাজারে।

এর পর তার সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয় কথা হয়। সে বলল, স্যার একটা কাজ করেন। কক্সবাজার জেলার প্রতিটি উপজেলা থেকে ২ জন করে সাংবাদিক নিয়ে একটি সাংবাদিক সংগঠন করি। আমি প্রথমে না বললেও পরে আমার খুবই প্রিয় একজন সংবাদকর্মী শহিদুল ইসলাম কাজলের সাথে পরামর্শ করলাম। সেও মত দিল। ঠিক করলাম নাম কি দিব। ভাবতে ভাবতে ঠিক করলাম উপকূলের মানুষ তাই উপকূলীয় সাংবাদিক ফোরাম হবে। যেই চিন্তা সে কাজ। আবার কাজল ভাইয়ের সাথে পরামর্শ। এর কিছুদিন পরই সংগঠন দাঁড় করালাম। উপস্থিত সবাই আমাকে সভাপতি আর শহিদুল ইসলাম কাজল ভাইকে সাধারন সম্পাদক করে ১১ সদস্যের সংগঠন হলো। পরে ২০১৬ সালে সেই হোবাইবকে সাধারন সম্পাদক করে কমিটি হলো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছে। আজ কক্সবাজার উপকূলীয় সাংবাদিক ফোরাম একটি প্রতিষ্টান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমি যা বলছিলাম, সেই পিচ্চি হোবাইব হাটি-হাটি পা-পা করে এগিয়েছে সংগোপনে। ১১ মে সোমবার ছিল তার জন্ম দিন। সকালে জোকারবার্গের বদন্যতায় তা জেনে তার ফেইসবুক টাইমলাইনে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি পোস্ট দিলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য- দিন গড়াতেই সেই হোবাইব মফস্বল সাংবাদিক মহলের প্রতিটি পোস্টে তার ছবি শোভা পাচ্ছে। শত শত সংবাদকর্মী ও পাঠক মহলের মনের কথা যেন বলছে হোবাইব। তার ছবিতে সয়লাব তাদের টাইম লাইন। ভাবতে বুক ফুলে যায় গর্বে। অথচ বহুমুখি সামাজিক রাজনৈতিক প্রতিকুলতার মধ্যে তার দিন যাচ্ছে। আমরা এমন এক জাতি, পরশ্রিকাতরতা আর প্রতিহিংসা আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। আর তারই শিকার হয়ে হাজারো হোবাইব হারিয়ে যাচ্ছে না ফুটতেই। কিন্তু প্রবল প্রতিভা আর আর অদম্য ইচ্ছা শক্তিকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারেনা। সে ফুটবেই। তেমনি আজ এক হোবাইব তার সাহস, ধৈর্য, প্রজ্ঞা আর প্রতিভার গুনে আজ এ অবস্থান সৃষ্টি করতে স্বক্ষম হয়েছে।

আমি বলছিনা সে ফেরেস্তা, মানুষ হিসাবে মানবিক গুনাবলিতে দোষ ত্রুটি থাকবেই। তার বয়স আর পারিপার্শিক কারনে সে হয়তো কিছুটা হতে পারে সাধারন মানুষ। হতে পারে ভুল আর থমকে যাওয়া। কিন্তু তারপরও প্রতিকুলতা তাকে আটকাতে পারবেনা।

যেমন পারেনি বৃটিশের মতো শক্তি কাজী নজরুল ইসলামকে দমিয়ে রাখতে। কিন্তু এ হোবাইব’রা বার বার হোঁচট কায় প্রতিহিংসার কড়গে। এ যেন তাদের জন্মই আজন্ম পাপ। আমরা পারিনা জ্ঞানীদের সম্মান করতে বা প্রতিভাকে সুযোগ করে দিতে। থাকতে পারে হোবাইবদের সাথে আমার রাজনৈতিক মত ভিন্নতা বা সামাজিক পারবারিক বিরোধ।

তা বলে সব কিছুতে যেন আমরা তালগোল পাকিয়ে ছাড়ি। বানরের মতো পিছনে লেজ টেনে ধরে যতক্ষন পারি রাখি, না পারলে নাই এমন অবস্থা আমাদের। সামাজিক আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর প্রতিকুলতা যেন কোন হোবাইব তলিয়ে না যায় সে প্রত্যাশা ন্যায় নিষ্টাবান বিবেকের সাথে আমারও! যতটুকু জানি হোবাইব ১৫ বছর আগে কলমের শক্তি কাজে লাগিয়ে মহেশখালীর প্রতিটি প্রান্তরে প্রতিটি ঘরে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মহান তাগিদে যে যাত্রা শুরু করেছিল তা অদ্যবদি চলমান।

লেখকঃ-
স.ম ইকবাল বাহার চৌধুরী
সভাপতি
কক্সবাজার উপকূলীয় সাংবাদিক ফোরাম।

আপনার মতামত লিখুন :