৩৫ লাখ টাকায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিক্রি, অভিযোগের তীর জয়-লেখকের দিকে!

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৮:২৫ AM, ১০ মার্চ ২০২০

নিউজ ডেস্ক:
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একমাত্র ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ যেন কোনোভাবেই নেতিবাচক খবর থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। গত ৪ জানুয়ারি, ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী থেকে অনেক আশা আকাঙ্খা নিয়ে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আল নাহিয়ান খান জয় এবং লেখক ভট্টচার্যের হাতে। কিন্তু তারাও এবার কলংকিত করেছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে। এমন অভিযোগই উঠেছে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে।

ভোরের পাতার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিক্রি হয়েছে ৩৫ লাখ টাকার বিনিময়ে। এ টাকার জোগান দিয়েছেন স্থানীয় বাঁশখালীর বিএনপি নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী। আর এক্ষেত্রে আল নাহিয়ান খান জয় এবং লেখক ভট্টচার্যের সাথে লিয়াজো বজায় রেখে কমিটি বাগিয়ে নিয়েছেন সার্জেন্ট জহুরুল হক শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন সুমন, যিনি বদিউজ্জামান সোহাগ এবং সিদ্দিকী নাজমুল আলমের কমিটিতে কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি পদে ছিলেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, রিয়াজ উদ্দিন সুমন জহুরুল হক হলের সাবেক শীর্ষ নেতা হওয়ার কারণে আল নাহিয়ান খান জয়ের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের কারণে লেনদেনর ভাগ জয়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিয়াজ উদ্দিন সুমনের আপন বোন চট্টগ্রাম জেলা যুব মহিলা দলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী।

বিতর্কিত চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া কমপক্ষে ১৫ জন নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে ভোরের পাতার এ প্রতিবেদকের। তারা সবাই বলেছেন, রিয়াজ উদ্দিন সুমনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাদের মোটা অংকের টাকা দিয়েই কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন। কেননা তারা অনেক পেশাজীবী এবং আগে ছাত্রদল ও শিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসাবে লিয়াকত চেয়ারম্যানও অনেক টাকা ব্যয় করেছেন এই কমিটি বের করে নেয়ার ক্ষেত্রে। টাকার অংক কমপক্ষে ৩৫ লাখ টাকা হবে বলেও দাবি করেছেন অনেকে।

উল্লেখ্য, ভোরের পাতার হাতে আল নাহিয়ান খান জয়ের একটি ফোনালাপও এসেছে। যেখানে রিয়াজ উদ্দিন সুমনের মাধ্যমে প্রস্তুুতি নিয়ে যোগাযোগ করলে কমিটিতে ঠাঁই পাওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করা হবে বলে দাবি করেছেন তিনি। এরপর বিতর্কিত সেই নেতা রিয়াজ উদ্দিন সুমনকে খুশি করেই নবঘোষিত চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন, যদিও তিনি শিবিরের কর্মী ছিলেন।
এদিকে, দুই দশকেরর বেশি সময় পর অছাত্র, বিবাহিত, শিবির ক্যাডার, অশিক্ষিত, নাশকতা ও চুরির মামলার আসামি, কাপড়ের দোকানদার, রেলের খালাসি, ব্যাংকারসহ বিতর্কিত ও অযোগ্যরা স্থান পেয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে। এ নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এছাড়া জেলা ছাত্রলীগের ইতিহাসে ২৭৬ সদস্যের বিশাল কমিটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, কমিটিতে স্থান দেয়ার ক্ষেত্রে বিশাল বাণিজ্য হয়েছে। বাণিজ্য করার জন্যই ঢাউস কমিটি করা হয়েছে। ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান অনেক নেতা এবং আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীলরা এ কমিটি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য ৪ মার্চ চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ১০১ সদস্যের জেলা কমিটি হওয়ার কথা। ২৯ বছরের ঊর্ধ্বে কোনো ছাত্রকে কমিটিতে রাখার সুযোগ নেই।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে দীর্ঘ ২২ বছর পর। এর আগে কখনও আংশিক কমিটি, কখনও ছিল আহ্বায়ক কমিটি। ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর এসএম বোরহান উদ্দিনকে সভাপতি ও আবু তাহেরকে সাধারণ সম্পাদক করে ৫১ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।

ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সভাপতি এসএম বোরহান উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের। এছাড়াও ৬০ জন সহ-সভাপতি, ৩৫ জন সহ-সম্পাদক, ১১ জন যুগ্ম সম্পাদক, ১১ জন সাংগঠনিক সম্পাদক, বিভাগীয় ও উপ-সম্পাদক ১৪৮ জন ও কার্যকরী সদস্য রাখা হয়েছে ১১ জন।

সাধারণ নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, নতুন কমিটির সহ-সভাপতি সোহরাব হোসেন চৌধুরী শুভ একটি হত্যা মামলার আসামি। কেএম পারভেজ উদ্দীন ছিলেন শিবির ক্যাডার। মো. মিনহাজুল আবেদীন নগরীর রেয়াজউদ্দীন বাজার তামাকুমণ্ডী লেইনের দোকানদার। ফয়সাল জামিল সাকির বয়স ৩৪ বছর। মো. মঈন উদ্দিন বিবাহিত। আবদুল খালেক খালিদ চন্দনাইশের কাঞ্চন নগর গ্রামে মায়মুনা হত্যা মামলার আসামি। জয়নুল আবেদিন ব্যাংকার। মামুন চন্দনাইশে নারী নির্যাতন মামলার আসামি। মনজুর আলম এসএসসির গণ্ডি পেরোননি, টেরিবাজারের দোকান কর্মচারী তিনি।

নেতাকর্মীরা আরও অভিযোগ করেন, সহ-সম্পাদক মো. রায়হান বাংলাদেশ রেলওয়েতে খালাসি হিসেবে কর্মরত আছেন। মোস্তাক আহমদ বিবাহিত। সাইফুদ্দিন খালেদ এসএসসি পাস করেননি। যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বহুজাতিক সার কারখানা কাফোকোতে চাকরি করেন।

বদরুদ্দোজা জুয়েল জনি হত্যা মামলার আসামি। সাংগঠনিক সম্পাদক কলিমুল্লাহ সাতকানিয়ার চিহ্নিত শিবির ক্যাডার। তিনি সাতকানিয়ার কেরানি হাটে জ্বালাও-পোড়াও নাশকতার ঘটনায় করা মামলার আসামি। হামিদ হোসাইন কোতোয়ালি থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ভাই।

উপসম্পাদক মোহাম্মদ এনাম খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বনফুলে চাকরি করেন (পটিয়া)। উপ-অর্থ সম্পাদক শহীদুল আলম একজন জুতা ব্যবসায়ী। উপ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এসএম সাইফুল্লাহ রাহাত ফোরএইচ গ্র“পের হিসাবরক্ষক। তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সুমি আক্তার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী ছিলেন। শিক্ষা ও পাঠচক্র উপসম্পাদক হয়েছেন ফিরোজুল ইসলাম মুন্না। তিনি ঢাকায় একটি কারখানায় কর্মরত।

কার্যকরী সদস্য মিজানুর রহমান লোহাগাড়া পূর্ব পুটিবিলা স্কুলের দফতরি। আক্কাস উদ্দিন একজন চিহ্নিত রাজাকারপুত্র! ফেসবুকে নতুন কমিটির যুগ্ম সম্পাদক রিদুয়ানুলের একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি চুরির মামলায় অন্য তিনজনসহ তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে সাতকানিয়া থানা পুলিশ। তছলিম উদ্দিন রানা নামে একজন এ ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘হায়রে ছাত্রলীগের কমিটি- কী করে ছাত্রনেতা হয় জানতে ইচ্ছা হয়…’।

এদিকে, আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে এবং বিতর্কিত এ কমিটি কিভাবে অনুমোদন দেয়া হয়েছে এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টচার্যকে রোববার কয়েকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও সেটির প্রতিউত্তর করেননি।

আপনার মতামত লিখুন :