রোহিঙ্গা হাকিম ডাকাতের এতই ক্ষমতা

Channel Cox.ComChannel Cox.Com
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:১৪ PM, ৩০ অক্টোবর ২০১৯

আব্দুল কুদ্দুস রানা:

মাথায় টুপি, কাঁধে বন্দুক, হাতে যোগাযোগ মাধ্যম ওয়াকিটকি নিয়ে টেকনাফের পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুখ্যাত ডাকাত সর্দার আবদুল হাকিম প্রকাশ হাকিম ডাকাত (৫০)। টাকার বিনিময়ে খুন, অপহণের পর ধর্ষণ ও মুক্তিপণ আদায়, লোকজনের ঘরবাড়িতে লুটপাট, চাঁদাবাজি, ইয়াবা ও অস্ত্র ব্যবসা, রোহিঙ্গা শিবিরে প্রত্যাবাসন বিরোধী কর্মকান্ড পরিচালনাসহ কিছুই বাদ নেই এই হাকিম ডাকাতের। পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকার আছে হাকিমের একাধিক উপদল ও আস্তানা । একেক এসময় হাকিম ডাকাত একেক আস্তানায় আত্মগোপন করে  চালিয়ে যাচ্ছে অপকর্ম ।

হাকিম ডাকাতকে ধরতে গত তিন বছরে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃংখলা বাহিনী পাহাড়ে-স্থলে দুই শতাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর সাথে একাধিক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে হাকিম বাহিনী ১১ সদস্য। তারপরও হাকিম ডাকাতকে ধরা যাচ্ছে না। তার কাছে নাকি জাদুরকাঠি আছে। তাই টেকনাফের মানুষের মুখেমুখে এখন গুঞ্জন-হাকিম ডাকাতের এতই ক্ষমতা ?

হাকিম ডাকাতের বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুর বড়ছড়া গ্রামে। তার পিতার নাম জয়নাল আলী প্রকাশ জানে আলম।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, হাকিম ডাকাতের বিরুদ্ধে এ থানায় মামলা আছে ১৮টি। এরমধ্যে হত্যা ৭টি, অপহরণ ৬টি, মাদক ২টি, ধর্ষণ ১টি, ডাকাতি ২টি। গত ছয় মাসে পুলিশের সঙ্গে হাকিম বাহিনীর একাধিক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে হাকিম বাহিনীর ৮ সদস্য। এরমধ্যে হাকিমের আপন চারভাইও রয়েছে।

ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, হাকিম ডাকাতকে ধরতে মরিয়া আইনশৃংখলা বাহিনী। গত তিনদিনে পুলিশ টেকনাফের শীলখালী, রঙিখালী, বাহারছড়া ও মূছনী রোহিঙ্গাশিবিরের পাহাড়ে অন্তত ১৫ বার সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেলে বাহিনীর লোকজন নিয়ে হাকিম ডাকাত অন্য আস্তানায় সরে পরে। দুর্গম পাহাড় বলে টানা অভিযান পরিচালনা সম্ভব হয়না।

# অস্ত্র লুট করেই আলোচনায় হাকিত ডাকাত :

২০১৬ সালের ১৩ মে ভোররাত তিনটা। হাকিমের নেতৃত্বে বাহিনীর ৩০-৩৫জন সদস্য হামলা চালায় টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া মুছনী রোহিঙ্গাশিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার ব্যারাকে। গুলিতে নিহত হন ব্যারাকের আনসার কমান্ডার মো. আলী হোসেন। এসময় আনসারের ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৬৭০টি গুলি নিয়ে পাহাড়ে আত্মগোপন করে হাকিম ডাকাত। পরদিন হাকিমসহ বাহিনীর ৩৫ সদস্যের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় খুনসহ অস্ত্র লুটের মামলা হয়। পরবর্তীতে র‌্যাব বিভিন্ন আস্তানায় হানা দিয়ে লুন্ঠিত ৯টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১১৫টি গুলিসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু হাকিম ডাকাত রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গত ২০ অক্টোবর ভোরে হাকিম বাহিনীর সদস্যরা টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালীর এক বাড়িতে ঢুকে স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা লুটের পাশাপাশি স্কুলপড়ুয়া দুই কিশোরী বোনকে তুলে নেয়। পাঁচদিন পর ২৫ অক্টোবর বিকালে পুলিশ তাদের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে।

বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন বলেন, উদ্ধারের পর দুইমেয়েকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এঘটনায় হাকিম ডাকাতসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু হাকিমকে ধরা যাচ্ছে না।

গত ৩ আগস্ট ভোরে টেকনাফের মেরিনড্রাইভ সড়কে হাকিম বাহিনীর সাথে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হন। এসময় পুলিশ ৭টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছিল।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা যুবক নিয়ে ২০১২ সালে আবদুল হাকিম গড়ে তুলে হাকিমবাহিনী। টেকনাফে পুরান পল্লানপাড়ার পাহাড়ে হাকিম বাহিনীর ছিল একাধিক অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। টেকনাফের বিতর্কিত এক জনপ্রতিনিধি হাকিম ডাকাতকে ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ করতেন ইয়াবা ব্যবসা। নেতার প্রভাবে হাকিম ডাকাত তখন থেকেই শুরু করে লোকজনকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি, খুন খারাপি, ধর্ষণ ইত্যাদি। ইয়াবার টাকায় কেনা হত আগ্নেয়াস্ত্র ও দুর্গম পাহাড়ে যোগাযোগের ওয়াকিটকি ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-এর ছবিসহ হাকিম ডাকাত প্রায় সময় ইউটিউব ও ফেসবুকে ভিডিও বার্তা প্রচার করে নিজের অবস্থান লোকজনকে জানান দিতেন। ভিডিওতে তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিরোধী উস্কানিমুলক বক্তব্য দিত।

# থেমে নেই অভিযান :

হাকিম ডাকাতকে ধরতে ড্রোন নিয়ে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব। শনিবার ভোরে টেকনাফের নয়াপাড়া, শালবন ও জাদিমুরা রোহিঙ্গাশিবির সংলগ্ন পাহাড়ে অভিযান চালায় র‌্যাব-১৫ বিশেষ দল। দুপুর ১২টা পর্যন্ত তারা পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাহিনীর পাঁচটি আস্তানা উচ্ছেদ করে। কিন্তু হাকিমের সন্ধান মিলেনি।

র‌্যাব-১৫ টেকনাফ কোম্পানী কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, ড্রোন ব্যবহার করে পাহাড়ে ডাকাতের আস্তানাগুলো শনাক্ত করা হচ্ছে। উচ্ছেদকৃত আস্তানাগুলোতে ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ, মাদক কারবারের ব্যবহার হত।  আগের দিন শুক্রবার টেকনাফের টইগ্যা পাহাড়ে ড্রোন উড়িয়ে হাকিম ডাকাতের আস্তানা অনুসন্ধান করে র্যা ব।

# হাকিম এখন কোথায় ?

পুলিশ, বনের কাঠুরিয়া ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হাকিম মাথায় টুপি, কাঁধে বন্দুক, হাতে ওয়াটকি নিয়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সঙ্গে আছে হাকিমের ভাই বশিরসহ ৬-৭ জন সদস্য। শনিবার মধ্যরাত পর্যন্ত হাকিম ডাকাতের অবস্থান ছিল হোয়াইক্যং এর খারাংখালী পাহাড়ে। র্যা বের অভিযান শুরুর আগে হাকিম বাহিনী স্থান পরিবর্তন করে চলে যান টইগ্যার পাহাড়ে। নিকট দুরত্বে থেকে হাকিমকে আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযানের গোপন তথ্য সরবরাহ দিচ্ছেন ১৭ মামলার আরেক পলাতক নুর হাফিজ। নুর হাফিজের বাড়ি নয়াবাজারে। হাকিমের সাথে ইয়াবা ব্যবসা করে নুর হাফিজ কোটিপতি। অভিযানের গোপন তথ্য নুর হাফিজকে পৌছে দেয় হোয়াইক্যং যুবলীগের এক নেতা। তার বাড়ি খারাংখালীতে। ওই নেতার বিরুদ্ধে ডাকাতদের আস্তানায় খাবার সরবরাহ দেওয়ার অভিযোগও আছে।

হোযাইক্যং ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের আহবায়ক হারুন সিকদার বলেন, যুবলীগ নেতা ও নুর হাফিজকে গ্রেপ্তার করা গেলে হাকিম ডাকাতের অবস্থান পরিস্কার হত। যুবলীগ নেতার মোটর সাইকেলে বসে একসময় নুর হাফিজকে এলাকায় ঘুরতে দেখা যেত।

# লেখক : দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো’র সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিষ্টাতা সাধারণ সম্পাদক

আপনার মতামত লিখুন :