• মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ন

মুসলিমদের আয়োজনে ৬০ বছর ধরে দুর্গাপূজা

সংবাদদাতা
আপডেট : শনিবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৯

মুসলিমদের আয়োজনে ৬০ বছর ধরে দুর্গাপূজা

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
কলকাতা শহরে ৬০ বছর ধরে হয়ে আসছে একটি দুর্গাপূজার আয়োজন। যেটির মূল উদ্যোগটাই নেন মুসলিমরা। কলকাতা বন্দরের কাছাকাছি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ খিদিরপুরের মুন্সিগঞ্জ এলাকায় সেই পূজার খোঁজ বাইরের মানুষ খুব একটা রাখেন না হয়তো। এবার সেই পূজার খবর জানিয়েছেন বিবিসি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাইরের মানুষ বিষয়টি সম্পর্কে না জানলেও পাড়ার মানুষের কাছে ঈদের মতোই উৎসবের সময় দুর্গাপূজা বা কালীপূজা। দুর্গাপূজা আদতে হিন্দু বাঙালীদের সবচেয়ে বড় উৎসব হলেও কালে কালে তা অন্যান্য ধর্মের মানুষের কাছেও হয়ে উঠেছে উৎসবের কাল।

পূজার সময়ে হিন্দুদের মতোই মুসলমান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈনসহ সকল ধর্মাবলম্বীরাই মেতে ওঠেন উৎসবে। অনেক স্থানে পূজার উদ্যোগেও জড়িয়ে থাকেন নানা ধর্মের মানুষ, যেমনটি মুন্সিগঞ্জের এই আয়োজন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বেশ সুন্দরভাবে প্রতিবছর পূজার আয়োজন হয়।

মুন্সিগঞ্জের তিন রাস্তার মোড়ে বেশ সাদামাটা প্যান্ডেল। বাহুল্য নেই। পূজার কয়েক দিন আগে প্যান্ডেল তৈরি করে তার পাশেই চলছিল দুর্গাপ্রতিমা গড়ার শেষ মুহূর্ত কাজ। সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট সালমান সর্দার। হাঁ করে থাকা দুর্গার বাহন সিংহের মুখের মধ্যে দিয়ে ভেতরে কিছু দেখা যায় কিনা দেখছিল সে।

সালমন বলছিল, ‘দুগ্গাপূজোয় খুব মজা হয়। ঠাকুর দেখতে যাই। ফুচকা আর আইসকিরিমের দোকান বসে, খাই – দোলনায় চাপি। আবার আমাদের পূজোয় চলে আসি।’ পূজাটাকে সালমান যেমন ছোটবেলা থেকেই ‘আমাদের পূজো’ বলে ভাবতে শিখেছে, তেমনই নিজেদের পূজা বলেই মনে করেন পাড়ার সবাই।

ঠাকুর নিয়ে আসতে যাই আমরা, প্যান্ডেলে ঠাকুর তোলা, দেখভাল – সবই মুসলমানরা করি হিন্দু ভাইদের সঙ্গে: শেখ বাবু

পূজা কমিটির প্রধান প্রেমনাথ সাহা বলছিলেন, ‘ষাট বছর ধরে এভাবেই পূজা হয়ে আসছে। আমাদের মামা, দাদাদের দেখেছি সকলে মিলে দুর্গাপূজা-কালীপূজা-ঈদ-মহররম পালন করতে, আমরাও সেভাবেই করি। আবার আমাদের জুনিয়ার যারা বড় হয়েছে, তারাও পূজার কাজে এগিয়ে আসে।’

প্রেমনাথ সাহা বলেন, ‘চাঁদা তোলা, ঠাকুর নিয়ে আসা, ভাসান দেয়া – সবটাতেই সবাই থাকি। এই তো মহরম গেল। আমরাও বাজার করেছি, খাবার বিলি করেছি, জল দিয়েছি। কখনও কোনও সমস্যা হয় না এ পাড়ায়। ১৯৯২এর বাবরি মসজিদ ভাঙার পরে যখন সারা দেশ জ্বলছিল, তখনও এ পাড়ায় তার আঁচ পড়ে নি।’

পাশে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিলেন পূজার আরেক উদ্যোক্তা শেখ বাবু। তিনি বললেন, ‘ঠাকুর নিয়ে আসতে যাই আমরা, প্যান্ডেলে ঠাকুর তোলা, দেখভাল – সবই মুসলমানরা করি হিন্দু ভাইদের সঙ্গে। কিন্তু প্রতিমার কাছে যারা পূজায় বসেন তারা হিন্দু, কারণ সেই কাজে তো মন্ত্র লাগে! আমি তো আর মন্ত্র জানি না!’

পূজার ব্যবস্থাপনায় পাড়ার মুসলমান ছেলেরাই সামনের সারিতে। প্যান্ডেল-কর্মীদের কাজ দেখভাল করছিলেন যে কয়েকজন, তাদেরই অন্যতম মুহম্মদ নাজিম। তিনি বলেন, ‘আসলে এটা রেডলাইট এলাকা তো। যেসব মানুষ এখানে থাকেন, বিশেষ করে মহিলারা, তারা কেউ একটা জাত বা ধর্মেরতো নয়।’

তরা কথায়, ‘যারা আসেন এ পাড়ায়, তারাও নানা জাত-ধর্মের। তাই আমাদের পাড়ায় জাতপাতের ব্যাপারটা নেই। হিন্দু-মুসলিম যাইহোক সব শিশু ছোট থেকেই একসঙ্গে বড় হয়। তারা এই ভাগাভাগিটা ছোট থেকেই দেখে না। আমরাও যেমন ছোট থেকে এভাবেই বড় হয়েছি,” বলছিলেন মুহম্মদ নাজিম।

এই এলাকায় পূজার চাঁদা সংগ্রহের দায়িত্বেও থাকেন মুসলমান ছেলেরাই

পূজা এসেই গেল বলতে গেলে, কিন্তু সবার কাছ থেকে চাঁদা তোলা হয়নি। তাই ভরদুপুরেই চাঁদার বিল নিয়ে বের হলেন কজন তরুণ। কানে এলো তারা দোকানদারদের বলছেন, ‘বছরে একবারই দুর্গাপূজা। একটু বুঝেশুনে চাঁদাটা দেবেন কাকা। তবে আপনার যা মন চায় তাই দেবেন।’

সেই চাঁদা তোলার দলেরই একজন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘আগে আমাদের পূজায় আর্টিস্ট এনে শো হত। এখন খরচ এত বেড়ে গেছে, সেসব বাদ দিতে হয়েছে। পাড়া প্রতিবেশী আর রাস্তা থেকে চাঁদা তুলে এক লাখ ২০ হাজার টাকার মতো ওঠে। তাই দিয়েই পূজা করতে হচ্ছে।’

কিন্তু আর কতদিন নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে শুধু চাঁদা তুলে পূজা চালিয়ে যেতে পারবেন, সেই চিন্তা রয়েছে মুন্সিগঞ্জের এই পাড়ার বাসিন্দাদের। পরে কী হবে, তা নিয়ে অবশ্য এখন আর ভাবতে চান না তারা, আগে এবারের পূজার কয়েকটা দিন আনন্দে কাটুক, সেই কল্পনা তাদের


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − two =

আরো বিভন্ন বিভাগের নিউজ